রাজধানীর সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৪১
সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে পড়ায় রাজধানী ঢাকা কার্যত সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও সার্বিক জনজীবনে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। বিরোধী জোটের আহূত টানা ৮৪ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচির কারণে গত রবিবার ভোর থেকেই সারাদেশের সবগুলো সড়কপথে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী যানবাহন যেমন বন্ধ, তেমনি চলাচল করছে না পণ্যবাহী পরিবহনও। ফলে সমগ্র যোগাযোগ ব্যবস্থায় নেমে এসেছে মারাত্মক বিপর্যয়। বিশেষত, পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় আমদানি-রফতানি ব্যবসা তথা শিল্পখাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা তৈরি পোশাক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রেতার হাতে পৌঁছাতে উচ্চব্যয়ে আকাশপথে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। বাংলাদেশ ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি মো. রুস্তম আলী ইত্তেফাককে বলেন, টানা হরতালের কারণে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে। চট্টগ্রাম, মংলা, বেনাপোল ও বুড়িমারীসহ বিভিন্ন বন্দরে যেমন হাজার হাজার টন আমদানিকৃত পণ্য জমা পড়ে আছে, তেমনি রফতানিমুখী শিল্পের কারখানাগুলোতেও জমে গেছে পণ্যের বিরাট স্তূপ। পরিবহন বন্ধ থাকায় শাক-সব্জি, ফলমূল ও ফুল উত্পাদনকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি জানান, দেশের কোথাও কোথাও বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তা প্রহরায় কিছু কিছু পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করছে। কিন্তু সেই সংখ্যা সবমিলিয়ে ৫ থেকে ৭ শতাংশ মাত্র। এ অবস্থায় শিল্প-কারখানার মালিক বা আমদানি-রফতানিকারকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যানের মালিক-শ্রমিকরাও শিকার হচ্ছেন অপূরণীয় ক্ষতির। সেই ক্ষতির দিকে কারো কোনো নজর নেই। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম জানান, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল থেকে প্রতিদিন সবমিলিয়ে প্রায় ৬শ’ পণ্যবাহী যানবাহন চট্টগ্রাম বন্দরে যায়। কিন্তু হরতালে সেটা হয় না। বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তায় কিছু কিছু যানবাহন চট্টগ্রামের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে গেলেও পথে নানা রকম বিপদের মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, গত সোমবার বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তায় ৩৫টি পণ্যবাহী গাড়ি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রফতানিকারকরা রাস্তার ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থার’ ওপর ভরসা রাখতে পারেননি। তাই শেষ পর্যন্ত পণ্য নিয়ে ঢাকা ছেড়ে যায় মাত্র ৭টি গাড়ি। পরে দেখা গেল যে, ওই ৭টি গাড়ির মধ্যে ২টি গাড়ি সীতাকুণ্ড পৌঁছানোর পর সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এতে গাড়ি দুটি যেমন পুড়ে গেছে, তেমনি ভস্মীভূত হয়েছে লাখ লাখ টাকার পণ্য। এই ঘটনার পর থেকে আর কেউ হরতালের মধ্যে সড়কপথে পণ্য পাঠাতে সাহস করছেন না। শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় গার্মেন্টস মালিকরা নির্ধারিত সময়ে তাদের পণ্য পাঠাতে পারছেন না। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে উচ্চ ব্যয়ে আকাশ পথে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু তাতে লাভের অংশ চলে যাচ্ছে কুমিরের পেটে। পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধের কারণে কেবলমাত্র তৈরি পোশাক শিল্পেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান তিনি। সড়ক পরিবহন ও এ সংশ্লিষ্ট অন্য একাধিক সূত্রের সাথে কথা বলে জানা গেছে, টানা হরতালের কারণে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাত বহুমুখী ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যারা ব্যবসা বা শিল্প গড়ে তুলেছেন, তাদের অনেকেই হরতালজনিত ক্ষতির কারণে ব্যাংকের কিস্তি খেলাপীর তালিকাভুক্ত হচ্ছেন। পরিবহন ব্যবস্থা অচল থাকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কারখানার শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন। সবমিলিয়ে গ্যাস-বিদ্যুত্জনিত প্রলম্বিত সংকটের মুখে থাকা শিল্পখাত এবার টানা হরতালের কারণে আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে জানালেন তারা।