আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের দুর্বলতা

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৩৮
আমাদের গ্রাজুয়েটদের প্রধানত তিনটি দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, লেখা এবং কথা বলার ক্ষেত্রে তাদের ‘কমিউনিকেশন’ দুর্বলতা রয়েছে। এ জন্য যদি কেউ ভালো চাকরি পেতে চায় তাহলে প্রথমে তার ‘কমিউনিকেশন’ দক্ষতা বাড়ানোর প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। আর এটা রিপোর্ট লেখা, ওরাল (মৌখিক/বাচিক) প্রেজেন্টেশন এবং বিতর্কে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্ভব। দ্বিতীয়ত, তারা ইংরেজিতে দুর্বল। এ জন্য ইংরেজির প্রতি গুরুত্ব দিতেই হবে। তৃতীয়ত, আজকাল প্রায় সব নিয়োগকর্তাই কম্পিউটারে দক্ষ কর্মীকে নিয়োগ দেন। আর এ জন্য যারা চাকুরি খুঁজছে, তাদের অবশ্যই কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে। এ ছাড়াও অফিস ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কৌশল সম্বন্ধে ধারণা থাকা উচিত একজন গ্র্যাজুয়েটের। অফিসের কাজের পরিবেশ, সহকর্মীদের সাথে কর্মময় জীবনে মানিয়ে চলার দক্ষতা অর্জনের কৌশল আত্মস্থ করতে হবে। যেসব বিষয়ে নজর দিতে হবে দরখাস্ত লেখার সময় একটু সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ দরখাস্তে বানান বা গ্রামাটিক্যাল কোনো ভুল থাকলে তা নিয়োগকর্তার মনে আপনার প্রতি নেগেটিভ ইমপ্রেশন সৃষ্টি করবে। তাছাড়া সাক্ষাত্কারের সময় প্রার্থীর উচিত প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন/কথা ঠিকমতো শোনা। অনেক প্রার্থীই পুরো প্রশ্ন না শুনেই উত্তর দেওয়া শুরু করে। এটা ঠিক না। আগে প্রশ্নটা ঠিকমতো শোনা উচিত এবং তারপরে বুঝে উত্তর দিতে হবে। অনুমানের উপর কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়া ঠিক না বরং এতে আপনার দূর্বলতাই প্রকাশ পাবে। এ ছাড়াও সিভিতে চাকরি সংশ্লিষ্ট নয় এমন কোনো প্রসঙ্গ উপস্থাপন করা উচিত নয়। কোনোমতেই মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা যাবে না। কেননা, যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি নিশ্চিত হলেও পরবর্তী পর্যায়ে চাকরি জীবনে উল্লেখিত মিথ্যা তথ্যের কারণে নিশ্চিতভাবেই সমস্যা তৈরি হবে। এতে অনেকের ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটে থাকে। সুতরাং এসব বিষয়ে সতর্কতার সাথে তথ্য উপস্থাপন করা উচিত। ক্যারিয়ার গঠনে বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের সঠিক পদ্ধতি এই অপশনকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো—ফরমাল, নন ফরমাল এবং সেলফ লার্নিং। ফরমাল লার্নিংয়ের জন্য কোর্সের অ্যাটেন্ডেন্স খুব জরুরি। দেশে অনেক প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের কোর্স অফার করছে। নন-ফরমাল লার্নিংয়ের জন্য প্রাসঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় বেতন দেওয়া হয় না। এমনকি নিয়োগকর্তা চান শিক্ষানবিশরা তাদের প্রশিক্ষণের ব্যয়ভার বহন করুক। আর সেলফ লার্নিংয়ের ক্ষেত্রে এখন অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ইন্টারনেটের ব্যাপক সহজলভ্যতার কারণে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য অনুসন্ধান করা এখন ঘরে বসেই সম্ভব। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উপায় বর্তমানে ডব্লিউটিও (ওয়ার্ল্ড ট্রেড অরগানাইজেশন)-এর অধীনে গ্যাটস (জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্রেড ইন সার্ভিসেস) চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রটাকে বিভিন্ন নিয়মের বেড়াজালে সীমিত করছে, বিশেষ করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে চাকরি করার ক্ষেত্রে। আমাদের দেশের ডিগ্রি যদি গ্লোবাল রিকোয়ারমেন্টের পর্যায়ে আরোপিত না হয় এবং প্রফেশনাল সোসাইটির প্রফেশনালদের রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি যদি যথাযথভাবে নির্ধারিত না হয়, তাহলে বাংলাদেশিদের পক্ষে দেশের বাইরে চাকরি পাওয়া কঠিন হবে। সিপিডি (কন্টিনিউইং প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট)-এর মাধ্যমে প্রফেশনালদের আপডেট করার জন্য প্রতিবছর ন্যূনতম কিছু প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করা উচিত। অন্যথায় তাদের লাইসেন্স রিনিউ করা হবে না। এমন নিয়ম নিশ্চিত করতে পারলে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত প্রফেশনালরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেক বেশি সচেতন হবে। দরকার হবে দৃষ্টিনন্দন কভার লেটার ভেবে নিন, আপনি একজন অভিনেতা এবং আপনার নিজস্ব এজেন্ট আছে। যখন আপনি কোনো চাকরির জন্য আবেদন করবেন, আপনার এজেন্ট সে প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করবে আপনার পক্ষ থেকে। যে খুব দ্রুত প্রতিষ্ঠানকে আপনার সম্পর্কে আইডিয়া দেবে, বলবে আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড এবং সঙ্গে এও বলবে কেন আপনি এ চাকরির জন্য সেরা। ফলে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান শিগগিরি আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে পার্সোনাল এজেন্ট নিয়োগ একটা লাক্সারি। অনেক ক্ষেত্রেই এটি হাস্যকরও বটে। কিন্তু ভাবতে হবে চাকরির ক্ষেত্রে পার্সোনাল এজেন্টের পরিবর্তে কে আপনাকে তুলে ধরতে পারবে সঠিকভাবে? একটা সহজ এবং স্মার্ট রাস্তা হলো কভার লেটার, যা আমরা কারিকুলাম ভিটার সাথে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানকে পাঠিয়ে থাকি। কভার লেটার খুব সহজেই আপনার পরিচয় দেবে, আর সেই সাথে বলবে আপনি কেন সঠিক প্রার্থী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কভার লেটার বিজ্ঞাপন মাধ্যম এবং আপনার কারিকুলাম ভিটার মধ্যে লিংক তৈরি করবে। আপনি যদি আশা করেন আপনার পার্সোনাল এজেন্ট স্মার্ট ড্রেস পরবে যেন তাকে দর্শনধারী এবং প্রফেশনাল মনে হয়, সেরকমই কভার লেটার দেখতে স্মার্ট এবং প্রফেশনাল হওয়া চাই। তাই সাদা ভালো কাগজে সুন্দর টাইপ করা অক্ষরে এটা তৈরি করতে হবে। আপনি যেমন আপনার এজেন্টকে সুন্দর পোশাকে দেখতে চান তেমনি আপনার কভার লেটারের কনটেন্ট ইফেক্টিভ হওয়া চাই। আর এ জন্য কয়েকটি কার্যকর নীতি আছে যা আপনাকে পজিটিভ রেজাল্ট পেতে সহায়তা করবে। কভার লেটারে অবশ্যই আপনার সাথে যোগাযোগের ঠিকানার পাশাপাশি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করবেন তার নাম, ঠিকানা এবং চাকরির রেফারেন্স অর্থাত্ কোন সূত্র থেকে আপনি এ চাকরির খোঁজ পেয়েছেন তা লিখতে হবে। চেষ্টা করতে হবে কোনো নাম বরাবরে কভার লেটার লিখতে। সূত্রে যদি তার উল্লেখ না থাকে তাহলে প্রতিষ্ঠানে ফোন করে জেনে নিতে হবে কনসার্ন পার্সনের নাম। তার সাথে তার পদবীও লিখতে হবে। প্রথম প্যারায় লিখতে হবে আপনি কী কী সংযুক্ত করছেন। এটা প্রমাণ করবে যে আপনি কাজের ক্ষেত্রে সংগঠিত এবং কার্যকরী। এরপর ফোকাস করতে হবে যে চাকরির জন্য আবেদন করছেন তার সম্পর্কে। পরের প্যারায় লিখবেন কীভাবে আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এই চাকরির সাথে মেলে। তবে কভার লেটারে সংক্ষিপ্ত আকারে লিখে সিভিতে বিস্তারিত লিখতে হবে। নিজের ব্যক্তিগত গুণগুলো এখানে পয়েন্ট আউট করতে পারেন, তবে সেটা অবশ্যই করতে হবে নম্রভাবে, উগ্রভাবে নয়। এমনভাবে লেখা উচিত যেন সেখান থেকে চাকরিদাতা বুঝে নেয় আপনি সাংগঠনিক, চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী, ভালো যোগাযোগে অভ্যস্ত এবং মানুষের মাঝে কাজ করতে পছন্দ করেন। তবে এটা চরিত্র এবং পার্সোনালিটি সম্পর্কে লেখার সময় দিতে হবে। সবসময় পজিটিভ কথা দিতে হবে। কম অভিজ্ঞতার জন্য অনুতাপের প্রয়োজন নেই। এরপর কভার লেটার শেষ করবেন। শেষ করার পূর্বে বলতে হবে আপনি সাক্ষাতকার দেওয়ার জন্য সবসময়ই প্রস্তুত যা আপনাকে আগামীতে তাদের সিদ্ধান্ত শোনানোর ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। শেষে ইউর সিনসিয়ারলি লিখে আপনার নাম লিখুন এবং স্বাক্ষর করুন। মনে রাখবেন কখনই এক কভার লেটার সব চাকরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা ঠিক নয়। প্রতিবারই এটাকে পুনরায় লিখবেন এবং সম্পাদনা করবেন। তাহলেই হয়ে যাবে স্মার্ট আর মানসম্পন্ন প্রফেশনাল কভার লেটার যা আপনাকে অন্যের দৃষ্টিগোচর করবে সহজেই।