নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ ও আমাদের করণীয়

আপডেট : ২০ মে ২০১৯, ২২:০১

বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে ‘রেপ’-এর মতো জঘন্যতম অপরাধ বেড়ে গেছে পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে, যেটি ভীষণ ভয়াবহ, ঘৃণ্য ও লোমহর্ষক। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে জানা যায় যে, বিশ্বে ধর্ষণের প্রথম দশটি দেশের মধ্যে রয়েছে আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইডেন, ভারত, ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, শ্রীলঙ্কা ও ইথিওপিয়া। আমেরিকার ব্যুরো অব জাস্টিস স্ট্যাটিসটিক অনুযায়ী  সেদেশে ধর্ষণের শিকার মোট সংখ্যার মধ্যে নারী ৯১% এবং পুরুষ ৮%। ন্যাশনাল ভায়োলেন্স এ্যাগেইনস্ট উমেন সার্ভে অনুযায়ী আমেরিকার প্রতি ছয়জন মহিলার মধ্যে একজন ধর্ষণের শিকার। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রতি এগারো জন পুরুষের মধ্যে একজন পুরুষ ধর্ষণের শিকার।  দেশটিতে চৌদ্দ বছর বয়স থেকে ধর্ষণের মতো অপরাধপ্রবণতা তৈরি হয় শিশুমনে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে বলা হয় Rape Capital of the World. সে দেশে ধর্ষণের শাস্তি মাত্র দুই বছরের কারাবাস। World Health Organization-এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ঘণ্টায় একজন নারী নির্যাতনের শিকার হয়। পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে যে ১৩-১৮ বছর বয়সী শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বেশি। ৮০% শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নতুন এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০০৩ এর ধারা ৯ অনুযায়ী কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ড, ধর্ষণের কারণে মৃত্যু ঘটলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত একলাখ টাকা অর্থদণ্ড। আবার দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের ফলে নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ঐ দলের প্রত্যেকে মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে এবং অতিরিক্ত একলাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।

গণমাধ্যম থেকে জানা যায়—ভারতে অপরাধ আইন (সংশোধনী) অধ্যাদেশ-এ ফাস্ট ট্রাক আদালত তৈরির বিধান রয়েছে। তদন্তের জন্য থানা এবং সমস্ত হাসপাতালকে বিশেষ ফরেনসিক কিট দেয়া হবে। উক্ত আইনানুযায়ী ধর্ষণ মামলার দুই মাসের মধ্যে পুরো বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা করতে হবে। ষোল বছরের নিচে কোনো মেয়েকে ধর্ষণ করলে কিংবা গণধর্ষণ করলে অভিযুক্তরা কোনোভাবেই আগাম জামিন পাবে না। নতুন এই অধ্যাদেশানুযায়ী বার বছরের নিচে শিশু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। যেকোনো ধর্ষকের শাস্তি ন্যূনতম দশ বছর। প্রাচীন ভারতে, গ্রিসে ও মিশরে ধর্ষণের শাস্তি ছিল পুরুষদের উপস্থচ্ছেদ বা ক্যাস্ট্রেশন। বিশ্বব্যাপী আইন রয়েছে যথেষ্ট সংখ্যায়, বিচারও রয়েছে কিন্তু নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হয়েই যাচ্ছে ক্রমাগত ও অহরহ। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো কোনো কোনো দেশে জোর করে সংশ্লিষ্ট মেয়েটিকে বা নারীকে Rapist-এর সাথেই বিয়ে দেয়। বাংলাদেশসহ সব দেশেই মোটামুটি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি হলো যেকোনো মেয়ে রেপড হলে মেয়েটিকেই অ্যাডালটারির (ব্যাভিচারী) দায়ে দোষ দেয়া হয়। আবার পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মতো দেশে ‘‘অনার কিলিং’’ প্রচলিত রয়েছে দেদারসে। এগুলোর প্রচলন একটি দেশ বা জাতির অন্ধকার গহবরে ডুবে যাওয়ারই ভয়াবহ লক্ষণ। Human Rights Commission of Pakistan বলেছে যে, ২০০৯ সালে ৪৬% অবৈধ নারী হত্যা সংঘটিত হয়েছে Honour Killing-এর মাধ্যমে। ২০০২ সালে মিডিয়াতে ব্যাপক সাড়া পড়েছিল পাকিস্তানে মুক্তারাম বিবির ‘Honour Raped’ হওয়ার ঘটনা যেক্ষেত্রে মুক্তারামকে ভিলেজ কাউন্সিলের অর্ডারে ‘গ্যাং রেপ’ করা হয়েছিল। আবার, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় যে, একটি মেয়ে তার পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করেছিল বলে পঞ্চায়েতের প্রভাবশালী সদস্যদের দ্বারা রেপড হয়েছিল মেয়েটি। এসবও পৃথিবীতে মনুষ্য সমাজে ঘটে! এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারের ব্যবস্থা সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। নারীরা ঘরের বাইরে যাতে চলাফেরা না করতে পারে, কাজ না করতে পারে সেজন্য এক ধরনের বিকৃত মানসিকতাও এ ধরনের অপরাধের জন্য দায়ী। একশভাগ শিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রগতিশীল মানব সমাজ গড়ে তুলতে আমাদের আশু ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘জেন্ডার ক্রাইম এডুকেশন’ বাধ্যতামূলক করাও জরুরি। আপামর জনসাধারণকে অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম টিভি ও গণমাধ্যমগুলোতে প্রচার করা প্রয়োজন। ইউটিউবসহ বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অশ্লীল কোনো বিষয় যাতে প্রচারিত না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাও জরুরি। নেশাদ্রব্যের ব্যবহার ও পাচার রোধে আরো কার্যকরী কর্মসূচি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবহন শ্রমিক ও পারিবারিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে গ্রহণও ভীষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বুদ্ধিচর্চার সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করতে হবে। সময়কে সত্কাজে ব্যয় করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি, সঙ্গীত, ছবি আঁকা—এগুলো পারিবারিক পরিবেশে জনপ্রিয় করার উপর জোর দিতে হবে। আমাদের নারীবান্ধব জননেত্রী শেখ হাসিনা নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করতে ইতিমধ্যে যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছেন- নারীদের সম্পত্তিতে সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ বিষয়ক বক্তব্য প্রদান করেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ দমনে ও অপরাধীর শাস্তি প্রদানে বদ্ধপরিকর সবাই আমরা জানি ও বিশ্বাস করি। তিনি অনেক পদক্ষেপও গ্রহণ করেছেন। জঙ্গিবাদ দমনে যেমনটি প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করেছেন, জনগণ সরকারকে সাহায্য করেছেন, তেমনটি নারী নির্যাতন, নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে সরকার মাঠে নেমে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কোনো অপরাধীই যাতে বের হয়ে না যায়—এমনটি না ঘটুক।  বিবেকবান মানুষ ও সমাজ তাই চায়। তবে জনগণকে সরকারের পাশে থাকতে হবে, বুঝতে হবে সরকারের একার পক্ষে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জনগণকে Universal Declaration of Human Rights, 1948 এর অনুচ্ছেদ ২৯ (১) অন্তরে লালন ও ধারণ করতে হবে, যেখানে সমাজের প্রতি প্রতিটি মানুষের দায়িত্বের কথা ঘোষণা করা হয়েছে (Human Duty-র কথা)-Everyone has duty to the society in which alone, the free and full development of his personality is possible. তবে স্মরণ করতে হয় সিঙ্গাপুরের (আধুনিক সিঙ্গাপুরের) জাতির জনক প্রয়াত লি কুয়ান ইউ-এর সাংবাদিকদের কাছে দেয়া এক বক্তব্যের কথা। সাংবাদিকরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন-আপনার দেশে এত কঠোর আইন কেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে, বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যখন সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় না, তখন সেটি করতে হয় কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে। সর্বোপরি অপরাধ দমনে মূল্যবোধের শিক্ষার বাস্তবমুখী কার্যক্রম আর দেরি না করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে ফলপ্রসূ করাও অতি জরুরি।

n  লেখক: প্রফেসর ও ডিন, আইন অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া