সেদিন ছিল ৬১ হিজরি ১০ মহররম। ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ফোরাতের দুকূল ছাপা নদীর কিনারায় ইমাম হোসাইন (রা.)-সহ তাঁর পরিবারের মোট ৭২ জন মর্দে মুজাহিদকে নির্মমভাবে হত্যা করে ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনার অবতারণা করা হয়। নিষ্ঠুর নরাধম সিমার হোসাইন (রা.)-র পবিত্র মস্তক কর্তন করে এজিদের দরবারে প্রেরণ করেছিল। এর মাধ্যমে ইসলামের শেষ সূর্য অস্তমিত হয় এবং ইসলামে রাজতন্ত্রের সূত্রপাত হয়। সেই থেকে আজ অবধি কিছু স্থানে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকলেও ইসলামী খেলাফতের ঊষার আলোর উন্মীলনে পৃথিবী উদ্ভাসিত হয়নি। শান্তির সোনালী সমাজ বিনির্মিত হয়নি। পৃথিবীবাসী পায়নি তাদের কাঙ্ক্ষিত জীবনের স্বপ্নের নিরাপদ ঠিকানা।
খেলাফতের বিষয়টি সৃষ্টির প্রারম্ভিক অবস্থায় সূচিত হয়েছে। আদম (আ.) কে সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা ফেরেশতাদের বলেছিলেন, আমি পৃথিবীতে আমার খলিফা বা প্রতিনিধি সৃজন করতে চাই। এর মাধ্যমে সমগ্র মানব জাতিকে খলিফা বা প্রতিনিধি হিসাবে সম্বোধন করেছেন। আর খলিফা থেকেই খেলাফত কথাটি এসেছে। মানুষকে যেহেতু আল্লাহ আশরাফুল মাখলুকাত করেছেন সেহেতু প মাণিত হয়ে গেছে, সমগ্র সৃষ্টির ওপর মানুষ আল্লাহর খলিফা। বিশেষ করে এই খেলাফতের দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছেন আল্লাহর নবী রসূলগণ ও তাদের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)। তিনি ৬৩ বছর এই পৃথিবীতে জীবন- যাপন করেছেন। তার মধ্যে নবুওয়াত পূর্ব ৪০ বছর। নবুওয়াত পরবর্তী ২৩ বছর। তার মধ্যে মক্কী জীবন ১৩ বছর। মাদানী জীবন ১০ বছর। মদীনার দশ বছর তিনি ছিলেন একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রধান নির্বাহী। মদীনা রাষ্ট্র শাসন পরিচালনার সময় তিনি সেখানের সকল নৈরাজ্য, চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন, ছিনতাই, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, সুদ, মাদক বন্ধ করে এমন সুখী সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রণয়ন করলেন যা জগত্বাসীর কাছে আজো মডেল হিসেবে রয়েছে। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে এমন সুখী সমাজ আর কখনো নির্মিত হয়নি। রসূল (স.) বলেন, আজ আনআ থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত একজন তরুণী স্বর্ণালংকারসহ রাতের অন্ধকারে একাকী পথ চলবে। সেখানে সে আল্লাহকে ছাড়া আর কারো ভয় করবে না। এমন কোন যুবকের সাহস হবে না যে, তার শরীর স্পর্শ করে ও তার স্বর্ণালংকার ছিনতাই করে নেয়। সুতরাং গোটা মদীনা নগরী ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ। রসূল (স.) এর ইন্তেকালের পর খলিফা নিযুক্ত হন তাঁর নিকটতম সাহাবী একনিষ্ঠ সহচর হযরত আবু বকর (রা.)। তিনি তিন বছর খেলাফত পরিচালনা করেন। তাঁর খেলাফতের প্রথম দিকেই ভণ্ড নবীদের উদ্ভব ঘটে। মুসায়লামাতুল কাজ্জাব নামে একজন ব্যক্তি বলেন, আমিই শেষ নবী। তোলায়হা আসাদী নামে এক লোক শেষ নবী দাবি করে। সাজাহ নামে এক মহিলা শেষ নবী বলে দাবি করে। আবু বকর (রা.) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। কিছু লোক যাকাত অস্বীকার করে। হযরত আবু বকর (রা.) তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তিনি পবিত্র কুরআনুল করীমকে গ্রন্থাকারে সংরক্ষণ করেন। তিন বছর খেলাফত শেষে স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান দুনিয়া থেকে বেহেশতের সুখবর পাওয়া এই বিশিষ্ট সাহাবী। তারপর সমসাময়িক সাহাবীদের পরামর্শক্রমে হযরত ওমর (রা.) কে খেলাফতের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনিও দুনিয়া থেকে বেহেশতের সুখবরপ্রাপ্ত। তিনি মুসলমান হওয়ার পরে ইসলাম প্রকাশ্য দিবালোকে উদ্ভাসিত হয়। তাঁর সম্পর্কে রসূল (স.) বলেন, আমার পরে কোনো নবী নেই; যদি আল্লাহ কাউকে নবী বানাতেন, তাহলে অবশ্যই ওমরকে নবী বানাতেন। তিনি দশ বছর খেলাফত পরিচালনা করেন। তাঁর সময় ইসলামী ভূখণ্ডের সীমানা ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়। রোম বিজয় হয়, পারস্য বিজয় হয়, আবিসিনিয়া, বাইজেন্টাইনসহ ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে মরক্কোর বারাত পর্যন্ত মুসলমানদের করতলগত হয়। আর তার শাসক ছিলেন আমীরুল মোমেনীন হযরত ওমর ফারুক (রা.)। তাঁর সময় তারাবী নামাজ জামায়াতবদ্ধ চালু হয়। তিনি জেরুজালেমের বিশৃংখলা নিয়ন্ত্রণ করেন নিজে সেখানে উপস্থিত হয়ে। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, আমি খলিফা থাকা অবস্থায় লোহিত সাগরের তীরেও যদি কোনো কুকুর ক্ষুধার্ত অবস্থায় মারা যায় তাহলে আমাকে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। তিনি রাত্রি জাগরণ করে প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট পর্যবেক্ষণ করতেন। একদিন একটি পরিবারে অভাব দেখে আটার বস্তা মাথায় করে তাদের কাছে পৌঁছে দেন। কিন্তু এক আততায়ীর হাতে তাঁকে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হয়। তিনি সেদিন ফজরের নামাজ পড়ছিলেন। সেখানে আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম জামার মধ্যে ছুরি লুক্কায়িত করে নামাজে হাজির হয়। যখন হযরত ওমর (রা.) সেজদায় গেলেন তখন তিনি ছুরি দিয়ে তাঁর মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করেন। তাতে ওমর (রা.) মারাত্মকভাবে জখম হন। শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তারপর তৃতীয় খলিফা হন হযরত ওসমান (রা.)। ইসলামের জন্য তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। রসূল (স.) তাঁর দুটি কন্যা তাঁর সঙ্গে বিবাহ দেন। এজন্য তাকে জিন্নুরাইন বা দুই নূরের অধিকারী বলা হয়। কুরআনের পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষণকারী। যার কারণে তাঁকে জামেউল কুরআন বা কুরআনের সংরক্ষণকারী বলা হয়। তিনিও দশ বছর খেলাফত পরিচালনা করেন। তাঁর বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ দেয়া হয়। এবং তাঁর বিরুদ্ধে একটি গ্রুপকে উস্কে দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীরা তাঁকে হত্যা করে ফেলে। তিনিও ছিলেন দুনিয়া থেকে বেহেশতের সুখবরপ্রাপ্ত। তারপর সমসাময়িক সাহাবিগণ হযরত আলী (রা.)-কে খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি সাত বছর খেলাফত পরিচালনা করেন। তাঁর সম্পর্কে রসূল (স.) বলেছেন, ‘আনা মাদিনাতুল ইলমু অ আলিউন বা’বুহা’ অর্থাত্ আমি হলাম জ্ঞানের রাজ্য আর আলী হলো সেই রাজ্যের দরজা। তিনিও স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেননি। তাঁকেও আততায়ীর হাতে জীবনপাত দিতে হয়। সেদিন তিনি ফজরের নামাজে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে আবু লুলু নামে একজন সন্ত্রাসী বিষাক্ত ছুরি নিয়ে আড়ালে লুকায়িত ছিলেন। তার পরে হযরত আলী (রা.) যাত্রাপথে সামনে অগ্রসর হলেই পিছন থেকে তাঁকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। আলী (রা.) এর ইন্তেকালের পরে তাঁর বড় পুত্র হাসান (রা.)-কে খেলাফতের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যেই তাঁর খাবারে বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়। তারপর উপস্থিত জনসাধারণ সাহাবী মুয়াবিয়াকে এই শর্তে খেলাফতের দায়িত্ব দেন যে, তিনি তাঁর শেষ সময়ে খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করবেন হযরত আলী (রা.) এর ছোট পুত্র হযরত হোসাইন (রা.)-কে। কিন্তু জনমতের কোনো তোয়াক্কা না করে তিনি তাঁর খেলাফতের শেষ সময়ে এসে তাঁর নিজ পুত্র এজিদকে খেলাফতের দায়িত্বে বসানোর প্রস্তাব দেন। আর এজিদ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা ঘোষণা দেয়। তখন চারদিক থেকে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কুফার লোকজন আবেদন করেন, হোসাইন (রা.) যদি কুফায় আসেন তাহলে আমরা একটা সমঝোতা করে হোসাইন (রা.)-কে খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করবো। তখন তিনি চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকিলকে প্রেরণ করেন। মুসলিম তাকে কুফায় আসার জন্য আহ্বান করলে তিনি পরিবার-পরিজনসহ মোট ৭২ জনের কাফেলা নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওয়ানা হন। এদিকে এই খবর পেয়ে এজিদ আবু সুফিয়ানের জারজ সন্তান সেনাপতি ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদকে সৈন্যসহ অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত করে প্রেরণ করে। যাতে হোসাইনকে কুফায় আসতে না দেয়া হয়। ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ সেই সময়ের নামকরা ডাকাত শিমারকেও সঙ্গে নেয়। তাদের কারবালায় এসে ওত পেতে বসে থাকে। ইমাম হোসাইন (রা.) এখানে এলে তারা তাদেরকে নিষেধ করে আপনি আর একটুও সম্মুখে অগ্রসর হবে না। আপনি মদীনায় ফিরে যাবেন। ইমাম হোসাইন (রা.) তাতে রাজি না হওয়ায় তাদের সঙ্গে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তিনি তাদের এই অন্যায় দাবির কাছে মাথানত করতে রাজি হননি। সেদিন ছিল ৬১ হিজরি ১০ মহররম। ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ফোরাতের দুকূল ছাপা নদীর কিনারায় ইমাম হোসাইন (রা.)-সহ তাঁর পরিবারের মোট ৭২ জন মর্দে মুজাহিদকে নির্মমভাবে হত্যা করে ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনার অবতারণা করা হয়। নিষ্ঠুর নরাধম শিমার হোসাইন (রা.)-র পবিত্র মস্তক কর্তন করে এজিদের দরবারে প্রেরণ করেছিল। এর মাধ্যমে ইসলামের শেষ সূর্য অস্তমিত হয় এবং ইসলামে রাজতন্ত্রের সূত্রপাত হয়। সেই থেকে আজ অবধি কিছু স্থানে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকলেও ইসলামী খেলাফতের ঊষার আলোর উন্মীলনে পৃথিবী উদ্ভাসিত হয়নি। শান্তির সোনালী সমাজ বিনির্মিত হয়নি। পৃথিবীবাসী পায়নি তাদের কাঙ্ক্ষিত জীবনের স্বপ্নের নিরাপদ ঠিকানা।
লেখক :সাংবাদিক
e-mail : [email protected]
