হরতালে হতাশ সিরাজগঞ্জের তাঁতিরা

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০৬
হরতালের বৈরী প্রভাবে সিরাজগঞ্জের তাঁতিরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কারণ, গত ক মাসে হরতালে জেলার ৩টি শাড়ি-লুঙ্গীর কাপড়ের হাটে বিক্রিতে ভাটা পড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যাপারীরা আসতে না পারায় সপ্তাহে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লেনদেনের জায়গায় হচ্ছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা। এজন্য পরিবার পরিজন তথা শ্রমিকের মজুরি দেয়া নিয়েও সমস্যায় পড়েছেন এই অঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার তাঁত ব্যবসায়ী। এ কারণে অনেকেই ব্যবসার পরিধি হ্রাস করছেন। যা চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে পড়ার আশংকা করে তাঁতিদের সংগঠন বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম পাওয়ারলুম ওনার্স এ্যাসোসিয়েশন ও হাট ইজারাদার বিরোধী দলের নেত্রীসহ প্রধানমন্ত্রীর কাছে কাপড়ের হাট হরতালের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে। সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প গড়ে ওঠে ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকে। এরপর অনেক ধাপ পেরিয়ে আজকের এই সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প। তবে হরতালে এই শিল্পটি ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন। হাটে বেচা-বিক্রি নেই বললেই চলে। সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ অঞ্চলে কাপড় কেনা-বেচার জন্য দেশের বৃহত্ ৩টি শাহজাদপুর, বেলকুচি ও এনায়েতপুর কাপড়ের হাট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব স্থানে সপ্তাহে ১০টি হাট বসে। সরেজমিনে বুধ ও বৃহস্পতিবার সকালে এনায়েতপুর কাপড়ের হাটে গিয়ে দেখা যায়, যথারীতি প্রায় ২ হাজারের মত তাঁতি হাটে নানা রংঙের শাড়ী-লুঙ্গী নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসে আছে। তবে যাদের জন্য তাদের এই আয়োজন। সেই ব্যাপারীরাই নেই এই হাটে। কারণ, একটাই হরতাল বিড়ম্বনা। রাস্তায় গাড়ি নেই। তাই আসতে পারছেন না তারা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে তাদের। হরতালের বিরূপ প্রভাবে ক্ষুব্ধ তারা। এ ব্যাপারে হাটটিতে আসা শিবপুর গ্রামের তাঁতি সাহেব আলী, রফিকুল ইসলাম, খুকনী গ্রামের খোকন, এনায়েতপুরের আমোদ আলী মেম্বার, দৌলতপুর গ্রামের হাজী শহিদুল ইসলাম, সারটিয়া গ্রামের নাসির হোসেন, কৈজুরীর বখতিয়ার রহমান, খোকশাবাড়ির সাহেব আলী, গোপালপুর গ্রামের কার্তিক গুণ জানান, গত কয়েক মাস ধরে থেমে থেমে ডাকা হরতালে জেলার ৩টি হাটেই কাপড় বিক্রি নেই বললেই চলে। আমাদের শুভক্ষণ পর্যন্ত হচ্ছে না। আবার যাওবা দাম বলে তা উত্পাদন খরচের চেয়েও কম। ১২শ টাকার শাড়ি দাম বলে ৯শ থেকে হাজার টাকা। এ অবস্থায় আমরা শ্রমিকের মজুরির পাশাপাশি নিজেদের সংসার চালানো নিয়ে চিন্তায় আছি। এদিকে হাটে হাজারো ব্যাপারীর জায়গায় দু-চারজন খুব কষ্ট করে এসেছেন। এরকমই একজন টাঙ্গাইলের কালিহাতীর ব্যাপারী লুত্ফর রহমান জানান, দেশ তথা ভারতে এখানকার উত্পাদিত বস্ত্রের কম-বেশি সাড়া বছরই চাহিদা থাকে। কিন্তু হরতালে সিরাজগঞ্জের হাটগুলোতে আমরা আসতে পারি না। এ কারণেই তাঁতিদের পাশাপাশি আমাদেরও সমস্যা হচ্ছে। তবে হরতালের কারণে শাড়ী-লুঙ্গীর দাম আগের চেয়ে কিছুটা কম। জেলার দেড় লাখ তাঁতের মধ্যে বিরূপ অবস্থার কারণে প্রতি সপ্তাহে অন্তত সাড়ে ৪শ কোটি টাকার কাপড় অবিক্রিত থাকায় বেশ কিছু তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন তাঁতিরা। এজন্য তাঁত শিল্প নির্ভর এ জেলার সামগ্রিক ক্ষেত্রেও মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। তাই তাঁতি ও ব্যাপারীদের সুবিধার্থে দুই নেত্রীর কাছে দ্রুত হরতাল বন্ধে একমত হবার আহবান তাঁত বিশেষজ্ঞ রাকিবুল করিম খান পাপ্পু, বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম পাওয়ারলুম ওনার্স এ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ন সম্পাদক এবং সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি বদিউজ্জামান বদি ও এনায়েতপুর হাট ইজারাদার আলহাজ্ব আব্দুল কদ্দুস সরকারের। রাকিবুল করিম খান পাপ্পু ও বদিউজ্জামান জানান, হরতালের কারণে বাজার মন্দা। তাই নিজের ৭২টি তাঁতের মধ্যে ৩০টি বন্ধ করে দিয়েছি। জেলার ৩টি হাটে যেখানে সপ্তাহে প্রায় ৫শ কোটি টাকা কাপড় বিক্রি হতো। সেখানে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫০ কোটিতে। এভাবে চললে এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে টেকানো যাবে না। তিনি আরো জানান, উত্তরাঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা জেলার প্রায় লাখো শ্রমিক এ শিল্পে নিয়োজিত রয়েছে। তাদেরকে আমরা কাজ দিতে পারছি না।