আকন্দ :কাব্যের দুয়োরাণী

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৩৪
ভুবনডাঙার মাঠে তখন আসন্ন সন্ধ্যার আলো-আঁধারি। কবি রবীন্দ্রনাথ গোয়ালপাড়ার পথ ধরে একাকী হেঁটে চলেছেন ব্যস্ত পায়ে। সন্ধ্যা নামছে তো বটেই তাছাড়া আরো একটা তাড়া আছে। সবে একখানি নতুন গানের সুর এসেছে মনে। সেটাকেই গুনগুনিয়ে চলেছেন, তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে ‘দিনুর’ হাতে দেবেন বলে। নইলে সে সুর হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথের পৌত্র দ্বিনেন্দ্রনাথ (রবীন্দ্রনাথ ডাকতেন ‘দিনু’) তার সব¬ নতুন সুর স্বরলিপি করে রেখে দেন, তাই তার হাতে পৌঁছে না দেয়া পর্যন্ত ভরসা পান না কবি। হঠাত্ ‘পথপ্রান্তে গোপন আঁধারে’ তার ‘পথ বেঁধে দিল’ বাংলার একান্তই অবহেলিত একটি গাছ—আকন্দ। কবির মনে হল, গাছটা যেন তাকে বলছে, ‘জগতের এত গাছ, লতা-পাতা ঠাঁই পেল তোমার কবিতায় কিন্তু এই হতচ্ছাড়া আকন্দ কি একবারও তোমার চোখে পড়ল না?’ খানিকটা অপরাধী মনে হল নিজেকে। মনে মনে কবি কথা দিলেন, ‘তোমার আসন কাব্যে দেব পেতে’। তবে লেখালেখি আর নানা কাজের ভিড়ে সেই ‘কথাটি রাখা’ আর হয়ে উঠল না। এর অনেক দিন পর, কবি তখন বিলেতে। বাড়ির জন্য মন-কেমন করা এক বিকালে হঠাত্ মনে পড়ে গেল বাংলার অবহেলিত গাছ আকন্দের কথা। বহুদিন আগে এক সন্ধ্যায় যাকে একটা ‘কথা’ দিয়েছিলেন তিনি। লিখলেন দীর্ঘ কবিতা—আকন্দ। এর ক’টা লাইন : “আছিলে কাব্যের দুয়োরাণী/ পথপ্রান্তে গোপন আঁধারে।/সঙ্গী যারা ছিল ঘিরে তারা সবে নামগোত্রহীন,/ কাড়িতে জানে না তারা পথিকের আঁখি উদাসীন।/ ভরিল আমার চিত্ত বিষ্ময়ের গভীর আনন্দ,/ চিনিলাম তোমারে আকন্দ।” কবিতাখানি ঠাঁই পেয়েছে পুরবী কাব্যে। চেহারায়, নামে, ফুলে বা ফলে এমন আহামরি কিছু নেই যা দিয়ে আকন্দ পথিকের ‘উদাসী আঁখিকে’ টানতে পারে। গাঁয়ের ঝোপঝাড়ে বা মেঠো পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকে নিতান্ত বাহুল্যের মত। তবে রাখাল বালকটির মত—সর্বদা হূষ্টপুষ্ট। কেউ তাকে খাতির করল কি করল না—তাতে যেন তার কিছুই এসে-যায় না। সারাদেশে বহাল তবিয়তেই আছে। এদের শত্রু খুব বেশি নেই। যে ছাগলে ‘কি না খায়’—সেই ব্ল্যাক বেঙ্গল গোটও সযত্নে এড়িয়ে চলে এদের। সম্ভবত এর পাতা চিবোতে তাদের বিশেষ সুবিধা হয় না। পাতার প্রান্তভাগ দেখতে অনেকটা কাঠাল পাতার মত। তবে আকন্দের পাতা অনেক পুরু এবং গোড়ার দিকটা পুরোপুরি উপবৃত্তাকার না হয়ে খানিকটা লম্বাটে। তাছাড়া কাঠাল পাতার মত উজ্জ্বল সবুজের জৌলুস নেই এর বরং একটা ধোঁয়াশা ভাব। পাতার দুদিকেই সাদা পাউডারের মত লেগে থাকে। রাস্তার ধারে আকন্দের ঝোপ দেখলে মনে হয়, কুয়াসার চাদর গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। উচ্চতা ৪ মিটার পর্যন্ত। এ গাছের আদিনিবাস বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বেডিয়া, ফিলিপাইন, নেপাল, ভুটান, চীনসহ এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। ফুল ফোঁটে থোকায় থোকায়। প্রতিটি ফুলে পাঁচটি পাঁপড়ি এবং তার মাঝে সুন্দর একটি ‘রাজমুকুট’। যে কারণে ইংরেজিতে একে বলে ক্রাউন ফ্লাওয়ার। এই ফুল নিয়ে বহু সুন্দর সুন্দর উপকথা ছড়িয়ে আছে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন—প্রভৃতি দেশে। মানুষের কাছে আদর না পেলেও আকন্দ প্রজাপতি, ভ্রমর, মৌমাছি—এদের ভারি প্রিয়। ভ্রমর বা ভোমরা আজকাল সচরাচর দেখা যায় না। তবে যা দুই একটা আছে তাদের প্রায়ই আকন্দ গাছের কাছে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। এ গাছে পিঁপড়েও থাকে প্রচুর। আকন্দকে কবিরা পাত্তা না দিলেও ‘কবিরাজরা’ কিন্তু ভেষজ উদ্ভিদ হিসাবে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন হাজার বছর আগে। তবে সে কথায় আসার আগে ছোট্ট একটা ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। বাগেরহাট পিসি কলেজ ক্যাম্পাসে কয়েকটা পুকুর আছে বেশ বড়সড়। সুখ-সরসী, নীল সরোবর—এমনি সব নাম। নীল সরোবরটা একেবারে ক্যাম্পাসের পূর্ব দিকে। তারই উত্তর-পূর্ব কোনায় বেশ কয়েকটা আকন্দের ঝোপ। বছর ত্রিরিশেক আগে কলেজের উপাধক্ষ্যকে একদিন সেই ঝোপের কাছে বসে থাকতে দেখে কয়েকজন ছাত্র কাছে ছুটে গিয়ে জানতে চাইল, ‘কোন সমস্যা হয়নি তো স্যার?’ শ্বেত-শশ্রুমন্ডিত প্রবীণ শিক্ষক চোখ না তুলেই উত্তর দিলেন, ‘চারদিকে কেমন চোখ উঠছে দেখেছ? কনজাংটিভাইটিস। খুব ছোঁয়াচে রোগ। এই যে গাছ দেখছ—এটা আকন্দ। আকন্দ দুই রকমের হয়। একটা শ্বেত আকন্দ অন্যটা সাধারণ। শ্বেত আকন্দের ফুল সাদা, অন্যটার বেগুনি।’ অধ্যাপক বলে চললেন, ‘এর পাতা ছিঁড়লে ঘন সাদা কস বেরোয়। দুই তিন দিন সকালবেলা দুই পায়ের বুড়ো আঙুলের নখের গোড়ায় এই শ্বেত আকন্দের কস লাগালে চোখ ওঠে না।’ কাকতালীয় হোক আর সত্যিকার কারণে হোক, যে সব ছাত্র এই প্রবীণ অধ্যাপকের কথামত এই কস মেখেছিল, সেবার তাদের চোখ ওঠেনি। আকন্দকে সংস্কৃতে বলা হয় অর্ক (অর্থাত্ সূর্য)। ভেষজ উদ্ভিদ হিসাবে এর উপকারিতার কথা মনে রেখেই সম্ভবত এমন নামকরণ। বৈজ্ঞানিক নাম : Calotropis gigantea. আয়ুর্বেদে আকন্দের পাতা, শিকড়, ফুল ভিন্ন ভিন্ন রোগ চিকিত্সায় ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। জ্বর, বাত, অজীর্ণ রোগ, কাশি, ঠান্ডা লাগা, একজিমা, অ্যাজমা ও ফোলা রোগ চিকিত্সায়, বমিভাব দূর করতে এবং বেদনা নাশক হিসাবে এ গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার হয়। তবে এর ফল বিষাক্ত বলে একটা পুরানো ধারণা প্রচলিত। প্রকৃতপক্ষে গরম কাল এর ফুল ফোঁটার সময় হলেও সারা বছরই আকন্দ গাছে ফুল ধরে। ফল পাকে বর্ষার আগে আগে। ফলের ভেতরটা ফাঁপা। পাকলে ফেটে গিয়ে লম্বা, সাদা, অনেকগুলো সূক্ষ্ম চুলওয়ালা খুব ছোট ছোট বীজ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। একটুখানি হাওয়া লাগলে উঠে যায় অনেক উঁচুতে। গ্রামে ছোটদের কেউ একে বলে ‘বুড়ির সুতা’ কেউ বলে ‘বুড়ির চুল’। তারা মনে করে, চাঁদের বুড়ি বসে বসে যে সুতো কাটে, তারই কিছু কিছু বাতাস চুরি করে নিয়ে আসে। যারা একে বুড়ির চুল বলে, তারা মনে করে এটা ডাইনি বুড়ির চুল। এ নিয়ে সুন্দর রূপকথাও আছে। গ্রামে ছোটরা এটা পেলে খুব মজা করে উড়িয়ে বেড়ায়।