তিন সপ্তাহে ১০ দিন হরতাল। এর মাঝখানে ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। কাঁচামাল না আসায় অনেক কারখানায় উত্পাদন বন্ধ ছিল। আবার অনেকে তৈরি পণ্য গন্তব্যে পাঠাতে পারেননি। টানা হরতালে কার্যত ভেঙ্গে পড়েছে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা। অনেকে বাড়তি ভাড়ায় পণ্য পরিবহন করছেন। তবে হরতালের পর গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তীব্র যানজট থাকায় তা-ও সময় মতো পৌঁছছে না।
উদ্যোক্তদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত চারদিন টানা হরতাল থাকায় উত্পাদিত পণ্য বা কাঁচামাল গন্তব্যে পৌঁছানো যায়নি। দিনের বেলার পাশাপাশি রাতেও হরতাল থাকার কারণে কারখানাগুলোতে কাঁচামাল না পৌঁছায় উত্পাদন বন্ধ থাকে। আমদানি করা পণ্য বন্দর থেকে খালাস না হলেও কিংবা রপ্তানি পণ্য বন্দরে না গেলেও উদ্যোক্তাদের চড়া সুদে নেয়া ব্যাংক ঋণের কিস্তি ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। একজন উদ্যোক্তা ক্ষোভের সাথে বললেন, ‘কারখানার চাকা না ঘুরলেও ব্যাংকের চাকা কিন্তু ঠিকই ঘুরেছে।’ অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকসহ নীতিনির্ধারক মহল এ বিষয়ে একেবারেই নীরব। গত তিন সপ্তাহে তিন দফায় মোট ১০ দিন হরতাল হলেও উদ্যোক্তাদের অবস্থা বিবেচনায় নীতি-নির্ধারক মহল থেকে কোন বিবৃতি আসেনি।
উদ্যোক্তাদের অনেকে বলছেন, হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার। রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল করতেই পারে। কিন্তু দেশের অর্থনীতির অবস্থাও তাদের বিবেচনায় আনতে হবে। দিনের বেলা হরতাল হলে রাতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ রাখতে হবে। অতীতে অনেক হরতালে এমনটি করা হয়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানান।
এদিকে জানা গেছে, হরতাল শেষ হবার পর চট্টগ্রাম থেকে পণ্যবাহী যেসব ট্রাক রওয়ানা দিয়েছে গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেগুলো ফেনীর মহিপালে এসে পৌঁছেছে। যাত্রীবাহী বাস এবং ট্রাকগুলো একসাথে রওয়ানা হওয়ার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয়, টানা তিনদিনের হরতালের পর উদ্যোক্তারা দ্রুত আমদানি এবং রপ্তানি পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এতে করে পরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে প্রায় তিনগুণ
সাভারে কারখানা আছে এমন একজন উদ্যোক্তা ইত্তেফাককে বলেন, তাঁর কারখানায় উত্পাদিত ৭০ টন সুতা হরতালের সময় কারখানার গোডাউনে পড়েছিলো। হরতাল শেষ হবার পর তড়িঘড়ি করে সেগুলো নরসিংদীতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া হরতালের কারণে বন্দর থেকে আমদানিকৃত তুলা কারখানায় আনা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান।
অপর একজন উদ্যোক্তা বলেন, হরতালের সময় রাতের বেলা কয়েকটি কাভার্ড ভ্যানে করে তিনি পণ্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে পিকেটাররা গভীর রাতে একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে অর্ধকোটি টাকার পণ্য পুড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, টানা হরতালের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর এবং বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোগুলোতে (আইসিডি) পণ্যের স্তূপ থাকায় পরিবহন ভাড়া বেড়েছে কয়েকগুণ। একজন পরিবহন ঠিকাদার জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম থেকে একটি কাভার্ড ভ্যানে পণ্য পরিবহনে সাধারণত খরচ হয় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। কিন্তু বুধবার এ ভাড়া ৩৫ হাজার টাকায় উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ ভাড়া ক্ষেত্রবিশেষে ৪২ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে। আবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পণ্য পাঠাতে প্রতি কাভার্ড ভ্যানে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা খরচ হলেও হরতালের কারণে তা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যেতে পারে এ ভয়ে অনেকে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে পণ্য পরিবহন করছেন। আবার অনেক উদ্যোক্তা পণ্য পরিবহনে অনীহা প্রকাশ করেছেন। পোর্টে ক্ষতিপূরণ দিয়ে হলেও কয়েকদিন পর পণ্য পরিবহন করতে চাইছেন এসব উদ্যোক্তা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তীব্র যানজট
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের কুমিরা, বাড়বকুন্ড, সীতাকুন্ড, মিরসরাই, বারৈয়ারহাট, মহিপাল প্রভৃতি এলাকায় তীব্র যানজটে গাড়িগুলোকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। আবার চৌদ্দগ্রাম, মিয়াবাজার, চান্দিনা, ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট, ইলিয়টগঞ্জ, গৌরিপুর প্রভৃতি এলাকায়ও তীব্র যানজট লেগেই ছিল। এসব এলাকায় গাড়িগুলো দাঁড় করিয়ে রেখে চালকদের কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়েন। যানজট কিছুটা শিথিল হয়ে আসলেও অলস গাড়িগুলোর কারণে পেছনের অনেক গাড়ি আটকা পড়ে।
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, মহাসড়কের সিটি গেইট থেকে বড়দারোগারহাট এলাকা পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার এলাকা ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ যানজট নিরসনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যানজটের কারণে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন দূরপাল্লার যাত্রীরা।
চান্দিনা ও বুড়িচং (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার থেকে চান্দিনা উপজেলাধীন কুটুম্বপুর পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটার জুড়ে যানবাহনের তীব্র চাপ চলছিল। চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা পণ্যবাহী ট্রাক চালক আব্দুল গফুর জানান, ‘বেরেক (ব্রেক) চাপতে চাপতে পা ধইরা আছে; আর ভাল লাগে না। সকাল ৬টায় পদুয়ার বাজার এলাকায় আসি। ৬ ঘণ্টায়ও ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারিনি’।
হাইওয়ে পুলিশ ইলিয়টগঞ্জ ফাঁড়ির সার্জেন্ট হাসান আহমেদ জানান, হরতাল শেষে বুধবার বিকেল থেকে শুরু হয় যান চলাচল। রাত ৩টায় মহাসড়কের নূরীতলা এলাকায় একটি দুর্ঘটনায় যানজটের সূত্রপাত ঘটে। ভোর সাড়ে ৫টায় খাদঘর এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যান বিকল হলে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। বর্তমানে যানজট তেমন বেশি না থাকলেও রয়েছে তীব্র চাপ। যানজট কমাতে মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে হাইওয়ে পুলিশের প্রায় শতাধিক সদস্য নিরলস প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানান, হাইওয়ে পুলিশ ময়নামতি ক্রসিং ফাঁড়ির ইনচার্জ (ওসি) মশিউর রহমান।
