বেশি আদর বেশি শাসন, কোনটাই ভালো নয়

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:২৬
হঠাত্ অতুলের ঘর থেকে ভীষণ চিত্কার আর কান্না শুনতে পেয়ে ছুটে গেলাম ওর ঘরে। আমার সাথে সাথে আশপাশের পাড়াপড়শিরাও মনে হল ছুটে আসবে ওর কান্না শুনে। গিয়ে আবিষ্কার করলাম কান্না আর চিত্কারের কারণ। আমার বোনের ছোট মেয়ে মিলি কেন ওর খেলনা দিয়ে খেলছে সেটাই এই চিত্কার কান্নাকাটির কারণ। আমার ছেলের বয়স সাত হতে চলল, আর বোনের মেয়ে মিলির বয়স ছয়। এভাবেই একমাত্র ছেলে অতুলের কাণ্ডকারখানা বর্ণনা করছিলেন মিসেস মনি। মিসেস মনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই অতুল ওর ঘরে কেউ ঢুকলে, ওর খেলনা কেউ ধরলে সে কান্নাকাটি, চিত্কার শুরু করে দেয়। ওর চিত্কার চেঁচামেচিতে থাকা কঠিন। মা হিসাবে অনেক বুঝিয়েছি কিন্তু একমাত্র ছেলে বলে আদর সবসময় বেশি পেয়েই এসেছে, সেজন্যই মনে হয় ওর এই স্বভাব। তবু একমাত্র ছেলে হিসাবে আদর তো একটু বেশি পাবেই। পরিবারে একমাত্র সন্তান হলে যেমন বাবা-মায়ের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যায় তেমনি নিজ মনষ্কামনা পূর্তিতে কোন অংশিদারিত্ব থাকে না। তবে ভাই-বোনের সম্পর্ক বোঝা, সবার সাথে ভাগাভাগি করে কাজ করা, মানিয়ে চলা-এ ধরনের মনোভাব গড়ে ওঠে না। নিজের জগতে অন্য কারও প্রবেশ সহ্য করার প্রবণতারও বিকাশ ঘটে না। বাবা-মায়ের অতিরিক্ত মনোযোগ, সাবধানতা সন্তানের সিদ্ধান্ত নেবার সক্ষমতার পরিপূরক। আগের যুগে এক এক পরিবারে ভাই-বোনের সংখ্যা হত দশ-বারোজন। এ ধরনের ক্ষেত্রে মা-বাবার পক্ষে তার সন্তানদের সে পরিমাণ মনোযোগ দেয়া সম্ভব হত না। যে বড় তাকে সবসময়ই তার ছোট ভাই-বোনকে দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে হত। ছোট ভাই বা বোনকে মানুষ করার ক্ষেত্রে মায়ের অনেক দায়িত্বই বড় সন্তান হিসাবে পালন করতে হত। বোনদের খাওয়া-দাওয়া, স্কুল-কলেজে যাওয়া আসা, দেখাশোনা— এ সবই। এ ধরনের পরিবেশ একজন শিশুর দায়িত্ববোধ বিকাশে, নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, দশজনের সাথে মানিয়ে চলার অভ্যাস বিকাশে প্রভাবক। যার অভাব আমরা বর্তমান যুগে সন্তানদের মাঝে একান্তভাবে লক্ষ্য করি। সুমাইয়া আক্তারের সাথে তার পঞ্চাশ বছরের জীবনের অভিজ্ঞতা জানতে কথা হচ্ছিল। সুমাইয়া আক্তার বলেন, আমরা ছিলাম নয় ভাই-বোন, পাঁচ বোন চার ভাই। আমি ভাই-বোনদের মাঝে পাঁচ নম্বর। আমার ছোট দুই ভাই, দুই বোন। ছোটবেলা থেকে বড় ভাই-বোনদের কাছ থেকে আমি অনেক সাহায্য পেয়ে এসেছি। স্কুলের পড়াশোনা থেকে শুরু করে সবকিছু আমার বড় বোনই করিয়ে দিত। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অনার্স মাস্টার্স সম্পন্ন করি। এখন ব্যাংকে চাকরি করি, সেটিও আমার সিদ্ধান্ত। পড়াশোনার বিষয় ঠিক করা থেকে সবকিছু আমারই ঠিক করা। এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বড় ভাই, আপার পরামর্শ আমাকে সাহায্য করেছে। আমার ছোট ভাই-বোনকে দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। আমি ওদের অংক, ইংরেজী পড়াতাম। বাবা-মা আমাদের দেখেছে, তারপরও আমি আমার দুই মেয়েকে মানুষ করার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ সময় বা মনোযোগ দেই তারচেয়ে অনেক কমই আমরা পেয়েছি কেননা, নয়জনকে এ পরিমাণ সময় দেয়া সম্ভব না একজনের পক্ষে। সে সময় পরিবেশ অনেক ভাল ছিল, তাই আমাদের স্বাধীনতাও অনেক বেশি ছিল। বড় আপার ছোট হয়ে যাওয়া জামা, খেলনা, বই-খাতা দিয়েই আমার ছোটবেলা কেটেছে। আমরা পাঁচ বোন একঘরে থাকতাম, আর ভাইয়েরা এক ঘরে। নিজের ঘর বলতে কিছু ছিল না। এখন আমার দুই মেয়ের জন্য আলাদা দুই ঘর। নিজেদের ঘরে অন্য কারও প্রবেশ পছন্দ করে না। ভাবি, ওরা কখনও হলে থাকতে পারবে না। তবে ধীরে ধীরে ওদের মধ্যে ভাগাভাগি করার স্বভাব হয়েছে। তারপরও বাড়িতে নিজেরা ঝগড়া করলেও বাইরে মিলেমিশেই থাকে। দুই বোনে এখন অনেক ভাব। নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয় প্রয়োজনে আমার সাথে, ওদের বাবার সাথে আলাপও করে। তবে শেষ পর্যন্ত নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয় এবং আমি ওদের বাধা দেই না, কেননা ওদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে এর প্রয়োজনীয়তা আছে। এভাবেই নিজের জীবন আর নিজ মেয়েদের গল্প বলছিলেন সুরাইয়া আক্তার । এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম বলছিলেন, একক সন্তান এমনকি শুধু এক ভাই-এক বোনের ক্ষেত্রেও তার জগত্ অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয় এবং নিজের অজান্তে তাদের মধ্যে স্বার্থপরতা গড়ে ওঠে। তুলনামূলক ভাগাভাগি, মানিয়ে চলা, ধৈর্য বৃদ্ধিসহ নানা গুণাবলীর বিকাশ ঘটে বহু ভাই-বোনের ক্ষেত্রে। তবে বর্তমান জনসংখ্যার পরিস্থিতিতে, বহু সন্তান নেয়াকে আমরা উত্সাহিত করতে পারি না। তাই ছোট পরিবারে বাবা-মাকে বিশেষভাবে তার সন্তানের মধ্যে এসব গুণাবলী বিকাশে সচেতন হতে হবে। সন্তান কিছু চাইলেই এখন তা পায়, তাই তার মধ্যে সেই ধৈর্যের বিকাশ ঘটে না। সন্তান যা চায় তাই সাধ্য থাকলে কিনে দেয়ার যে প্রবণতা বাবা-মায়ের মাঝে দেখা যায়, তা দূর করতে হবে। পূর্বে সচ্ছল পরিবারেও পিতা-মাতার একটি মাত্রা ছিল যে, এই নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি সন্তান পাবে না। খুব বেশি পরিমাণ জামা-কাপড়, খেলনা থাকবে না। তাই তাদের ধৈর্য বৃদ্ধি পেত, চাইলেই পেত না। বাবা-মায়ের তার সন্তানের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, ধৈর্য বিকাশ, সবার সাথে মিলেমিশে ও সকল পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলার স্বভাব বৃদ্ধিতে একান্তভাবে সচেতন হতে হবে, কেননা বর্তমানের শিশু জাতির ভবিষ্যত্। সন্তানের সব কাজে বাবা-মায়ের অংশগ্রহণ, অতিরিক্ত মনোযোগ সন্তানের নিজস্ব মতামত বিকাশে বাধা হয়ে ওঠে, যা বাবা-মায়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার জন্য দায়ী। তাই একমাত্র সন্তান হলেও তাকে ছাড়তে হবে, নিজের মত কাজের সুযোগ দিতে হবে। চাচাতো, খালাতো ভাই- বোনদের সাথে আপন ভাই বোনের মত মিশতে দিতে হবে, যেন মানিয়ে চলা, সবার সাথে ভাগাভাগি করে কাজ করা, এ স্বভাবগুলোর বিকাশ তার মধ্যে ঘটে। পরনির্ভরশীলতা দূর হয়, নিজস্বতা বিকাশ পায়।