স ং গ ঠ ন .................................................

মৃত্তিকায় স্বপ্নগাঁথা

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:২৮
মাটি ও মানুষের মধ্যে আছে এক আত্মিক সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের ভিত্তিতেই মানুষ আজকের যান্ত্রিক পৃথিবীতেও মাটিকে আঁকড়ে বেঁচে আছে। সেই আত্মিক সম্পর্ককে ভিত্তি করে মানুষ নিজেদের মধ্যে এক অদ্ভুত সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। সমাজ, মানুষ আর মাটি তখন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যায়। ‘মৃত্তিকা’ একটি সামাজিক আন্দোলনের নাম। মাদক, উচ্ছৃংখলতা আর দিশেহারা এক তরুণ প্রজন্মের সামনে একটি অবাক করা উদাহরণ। মৃত্তিকা শব্দের অর্থ মাটি। আর এই সংগঠন মৃত্তিকার তাত্পর্য হল, মাটি যেমন ধনী দরিদ্র সবার আশ্রয়দাতা, তারাও তেমনি সবার সাথে সমান থাকবে, মাটি একই সাথে কঠিন আবার কোমল,তারাও যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠিন এবং অসহায়ের জন্য কোমল থাকবে, মাটি বলতে আবার দেশের মাটিও বুঝায় অর্থাত্ মৃত্তিকা শব্দটি দ্বারা তারা দেশেরও প্রতিনিধিত্ব করছে, এই দেশের মৃত্তিকা তো ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা,তারা সেই মহান চেতনাকে কাজে ব্যবহার করে নিজেদের সর্বদা মানুষের জন্য ও পরোপকারে বিলিয়ে দিতে সচেষ্ট থাকবে। সিফাত হাসান সঙ্গীত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এই সংগঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা। তিনি সংগঠনের শুরু সম্পর্কে বলেন, ‘আমি তখন ৫ম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুল বাসে যাতায়াত করি। বাসটা যখন মোহাম্মদপুর টাউনহলের সামনে দাঁড়াতো তখন কিছু ভিক্ষুক,পথশিশু আমাদের বাসের কাছে এসে বলত, ‘দুইডা ট্যাকা দিবেন,ভাত খামু’।আমি তখন সত্যি ভেবেছিলাম এরা ভাত খেতে পায় না তাই টাকা চাচ্ছে। আমার মাথায় তখন চিন্তা এল আমরা যদি প্রতিদিন আমাদের টিফিন থেকে কিছু বাঁচিয়ে এদের দেই তাহলেই তো এরা খেতে পাবে। আমরা আসলে তখন টিফিন খেতাম না, বাসায় বকা দিবে তাই অনেকাংশই ফেলে দিতাম। তাই ভাবলাম ফেলে না দিয়ে এদের দেয়াই ভাল। বাসের অন্যদের নিয়ে একটা গ্রুপ করলাম, যারা প্রতিদিনের টিফিনের কিছু অংশ পথশিশুদের দিব। বলাই বাহুল্য আমাদের কাজটা বেশিদূর যায়নি। কারণ ঐ সব শিশুরা আমাদের টিফিনের থেকে ২ টাকা বেশি পছন্দ করত! তবে ঐ সময় থেকেই ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। ওটাকেই মৃত্তিকার প্রথম ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা যেতে পারে। এভাবেই মৃত্তিকার বীজ আমার মাথায় ঢুকেছিল। যার পরিণতি আজকের মৃত্তিকা! তবে আজকের মৃত্তিকাও একদিনে কিংবা একজনের চেষ্টায় হয়নি।’ বন্যায় বিপদহগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ বিতরণ, রানা প্লাজায় দুর্গতদের সাহায্য করা, এতিমদের জন্য ইফতার পার্টি আয়োজন সব টাকাই নিজেরা ঘুরে ঘুরে তুলেছে তারা। আর বিভিন্ন জায়গায় অসহায় দরিদ্র বাচ্চাদের কাপড় ও শীতবস্ত্র প্রদানসহ নানা ধরনের সমাজসেবা মূলক কাজ তারা করে থাকে। ২০১৩ সালে মৃত্তিকা নিজের জন্য একটা ঠিকানা খুঁজে পায়। নিপার বাসার গ্যারেজে তাঁর বাবা সংগঠনকে জায়গা দেন। সেজন্য তিনি তাদেরকে তাঁর বাড়ির গার্ডরুমকে মৃত্তিকার অফিস হিসাবে ব্যবহারের অনুমতি দেন। সেখানে তারা ঐ এলাকার বস্তির কিছু বাচ্চাদের নিয়ে শুরু করে মৃত্তিকা স্কুল। জানুয়ারিতে যাত্রা শুরু করলো মৃত্তিকা স্কুল। মৃত্তিকার সদস্যদের মধ্যে থেকে ৭ জন নিয়মিত ও ১০ জন পার্টটাইম টিচার মিলে দায়িত্ব নিলো মোহাম্মদপুর হাউজিং লিমিটেডের ৫ নম্বর রোডের বস্তির ৪৩ জন বাচ্চার শিক্ষা বিস্তারে। বাচ্চাদের ভাগ করা হলো প্লে গ্রুপ থেকে শুরু করে ক্লাস প্রি পর্যন্ত বিভিন্ন ভাগে। মৃত্তিকার সদস্য সংখ্যা ৫০ জন হলেও সবাই পড়াতে পারতো না। আমরা ১৭ জন মিলে মূলত স্কুলটাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম। বাচ্চাদের কাছে সবচাইতে প্রিয় শিক্ষক ছিলো বন্ধু রাকিব এবং দিয়া। বাচ্চাদের ভাষায় রাকিব ভাইয়া আর দিয়া আপু। বাচ্চাদের সাথে মৃত্তিকা স্বাধীনতা দিবস, নববর্ষ, ইফতার পার্টি বিভিন্ন অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়।