পুণ্যস্নান, পূজা, মেলা, কীর্তন, শঙ্খ বাজিয়ে মন্ত্রপাঠ ও আরাধনার মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার সুন্দরবনের দুবলার চরে সম্পন্ন হয়েছে ঐতিহ্যবাহী রাস উত্সব। মূলত হিন্দু সমপ্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও এটি কালের বিবর্তনে পরিণত হয়েছে সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মেলা উপলক্ষে গত শুক্রবার এখানে সমবেত হয়েছিলেন নানা বয়সের মানুষ। গতকাল সকালে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে পুণ্যস্নানের মধ্য দিয়ে ৩ দিনের এ উত্সবের সমাপ্তি ঘটে।
এদিকে রাস উত্সব উপলক্ষে দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গণে গত শনিবার বিকেল থেকে মাসব্যাপী রাস মেলা শুরু হয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় শ্রী শ্রী মদনমোহন সেবাশ্রমে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে তিনদিনের রাস মেলা।
মংলা সংবাদদাতা জানান, শুক্রবার শুরু হয়ে উত্সবমুখর পরিবেশে গতকাল শেষ হয়েছে দুবলার চরের ঐতিহ্যবাহী রাস উত্সব। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এবার উত্সবে দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীদের উপস্থিতি অন্যবারের তুলনায় কম ছিল বলে জানিয়েছেন মেলার আয়োজক কমিটির আহবায়ক মেজর (অব.) জিয়া উদ্দিন আহম্মেদ।
হিন্দু সমপ্রদায়ের মানুষেরা মনে করেন, তাদের দেবতা শ্রী কৃষ্ণ তীর্থ স্থানে এসে পুণ্যস্নান করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ দুবলার চরে জড়ো হয়ে পুণ্যস্নান করেন। পুণ্যার্থীদের মতে, এই স্নানের মধ্যে দিয়ে সকল পাপ মোচন এবং মনের ইচ্ছা পূরণ হয়। তাই ঈশ্বরকে খুশি করতে হিন্দু সমপ্রদায়ের লোকেরা গত দুই যুগ ধরে জাঁকজমকভাবে রাস উত্সব পালন করে আসছেন।
এদিকে উত্সবে অংশ নেবার নামে তীর্থযাত্রী বেশে এক শ্রেণীর শিকারী সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে হরিণ নিধনের মহোত্সবে মেতে ওঠেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। পশ্চিম বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. তৌফিকুল ইসলাম জানান, বন বিভাগ সুন্দরবনের অভ্যন্তরে অভিযান চালিয়ে ২টি ট্রলারসহ ২৭ জনকে আটক ও ১৫ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করেছে। আটককৃতরা বন বিভাগের পারমিট না নিয়ে অবৈধ উপায়ে সুন্দরবনে অনুপ্রবেশ করে হরিণ শিকার করেন। এদের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা হয়েছে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, কুয়াকাটায় দু’দিনের রাস উত্সব গতকাল শেষ হয়েছে। এ সময় হাজার হাজার পুণ্যার্থী আর পর্যটকদের মিলনমেলায় পরিণত হয় সৈকতসহ সমগ্র কুয়াকাটা এলাকা। সাগর পাড়ের নারিকেল কুঞ্জ সংলগ্ন রাধাকৃষ্ণ মন্দির ও তীর্থযাত্রী সেবাশ্রম প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় রাতব্যাপী রাসলীলা, পদাবলী কীর্তন, ভগবত পাঠ, ধর্মীয় সঙ্গীত ও ভোর কীর্তনসহ নানা অনুষ্ঠানের। গতকাল প্রত্যুষে সাগরে পুণ্যস্নান সম্পন্ন করেন পুণ্যার্থীরা।
গলাচিপা সংবাদদাতা জানান, স্থানীয় রাধা মাধব সেবাশ্রমের উদ্যোগে রবিবার উদযাপিত হয় হিন্দু সমপ্রদায়ের রাস পূর্ণিমার পুণ্যস্নান উত্সব। চার দিনব্যাপী এই উত্সবের শেষ দিনে রামনাবাদ নদী তীরে পুণ্যস্নানের জন্য পুণ্যার্থীদের ঢল নামে। গোটা এলাকা মুখরিত হয়ে উঠে ভক্তদের উলুধ্বনি, খোল আর করতালে। সূর্য দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে একযোগে হাজারো পুণ্যার্থী অংশ নেন পবিত্র পুণ্যস্নানে। দুপুর পর্যন্ত চলে এ স্নানোত্সব। এছাড়া গত চারদিন ধরে এখানে চলছে ধর্মীয় মেলা। উত্সব কমিটির সভাপতি শংকর লাল দাশ জানান, রাতে রাধাকৃষ্ণের রাসলীলার মধ্য দিয়ে এ উত্সবের সমাপ্তি হবে।
কলাপাড়া সংবাদদাতা জানান, স্থানীয় শ্রী শ্রী মদনমোহন সেবাশ্রমে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী রাসপূজা ও মেলা। মেলা চলবে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত।
দিনাজপুর স্টাফ রিপোর্টার জানান, জেলার কাহারোল উপজেলার কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী রাস মেলার উদ্বোধন করেন হিন্দু দেবোত্তর এস্টেটের ট্রাস্টি ও জেলা প্রশাসক আহমেদ শামীম আল রাজী। এ উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে যাত্রা, পুতুল নাচ ও দেশি-বিদেশি খাবার দোকান বসেছে।
মন্দিরের পুরোহিত পুলিন চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর গোপীদের নিয়ে বৃন্দাবনে রাস উত্সবে মেতে উঠতেন। সেই ধারা অনুসারে ১৭৫২ সালে মন্দির নির্মাণের পর থেকে এখানে মাসব্যাপী রাস মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
