আব্বু যখন এ লেভেলের ছাত্র, তখন জেহানজেব কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেন। সেখানে থাকলে পড়াশুনায় তার বেশ সুবিধা হতো। কিন্তু দাদা সেখানে থাকবার খরচ দিতে রাজি হলেন না। দাদা নয়াদিল্লীতে লেখাপড়া শিখেছেন বিনাবেতনে। একটা মসজিদে তিনি তালিব হিসাবে থাকতেন। ফলে তার থাকা খাওয়া বা পড়াশুনার কোন খরচ ছিল না। মসজিদে যেসব ছাত্র থাকতো, স্থানীয় বাসিন্দারাই তাদের খাওয়া-পরার খরচ জোগাতেন। জেহানজেব কলেজে আব্বুর বেতন লাগতো না বটে তবে থাকা-খাওয়ার খরচ দরকার ছিলো। পাকিস্তানের কোন ব্যাংকে তখন শিক্ষাঋণের ব্যবস্থা ছিলো না। কলেজটি ছিলো মিঙ্গোরার পার্শ্ববর্তী ছোট্ট শহর সাইদু শরিফে। সেখানে আব্বুর পরিচিত এমন কোন পরিবারও ছিলো না, যেখানে তিনি থাকতে পারেন। এই একটি কলেজ ছাড়া এ এলাকায় আর কোন কলেজ ছিলো না। সুতরাং আব্বু যদি তার কলেজে পড়াশুনা করার সুযোগ না পান তবে তার পড়াশুনাই হবে না। এতদিন যে স্বপ্ন তিনি দেখেছেন, তা অপূর্ণ থেকে যাবে। হতাশায় ভেঙ্গে পড়লেন তিনি। তখন তাঁর মা-ও বেঁচে নেই। ডিগ্রি পাসের আগে মারা যান দাদী। বেঁচে থাকলে, তিনি আব্বুকে সমর্থন করতেন—এটা আব্বু ভালো করেই জানতেন। আব্বু দাদার কাছে নানাভাবে কাকুতি-মিনতি করলেন কিন্তু কোন কাজ হলো না। এই পরিস্থিতিতে আব্বুর শেষ ভরসা ছিলো করাচিতে আমার এক মামা। দাদাও বললেন, আব্বু কলেজে যেতে চাইলে তিনি সেই চেষ্টা করে দেখতে পারেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই আমার মামাবাড়ি থেকে মামারা এলেন আমার দাদীর মৃত্যুতে আমাদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য। আব্বু তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বললে তারা হয়ত আপত্তি করতেন না। কিন্তু তিনদিনের বাসভ্রমণের পর এই ক্লান্ত মানুষগুলো আমাদের বাড়িতে ঢুকতেই দাদা কথাটা পাড়লেন তাদের কাছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে অত্যন্ত রুষ্ট হয়েছিলেন তারা এবং আমার এক মামা দাদার মুখের ওপরই একেবারে না বলে দিলেন। দাদা ভীষণ রেগে গেলেন। আমার মামারা যতদিন আমাদের বাড়িতে ছিলেন, দাদা তাদের সঙ্গে একবারও কথা বললেন না। আব্বু বুঝলেন, তার সব আশা শেষ। এখন তাকে তার বড় ভাইয়ের মতো গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। আমার বড় চাচা যে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, সেটা পাহাড়ের ওপরকার সেউর গ্রামে। আমাদের বাড়ি থেকে দেড় ঘণ্টার পথ এবং এই পুরো পথটাই খাঁড়া উপরের দিকে। ছোট স্কুল। নিজস্ব পাকা ভবনও নেই। শ’খানেক ছাত্র, যাদের বয়স পাঁচ থেকে পনেরো বছরের মধ্যে।
সেউর গ্রামের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই গুজর, কোহিস্তানি ও মিয়ান গোত্রের। মিয়ান গোত্রের লোকরা প্রধানত সমতলের বাসিন্দা এবং সুসভ্য হিসাবে পরিচিত। কিন্তু গুজর ও কোহিস্তানিরা হলো পাহাড়ি উপজাতি। এদের বেশিরভাগই কৃষক ও মোষপালক। এদের ছেলে-মেয়েরা সাধারণত খুব নোংরা। পশতুনরা তাদের ভালো চোখে দেখতো না। তারা বলতো, ‘এই পাহাড়ি উপজাতীয়রা কালো, নোংরা ও নির্বোধ’। লোকে বলতো, ‘এদের লেখা-পড়া শেখানো দরকার’। কেউ সেই স্কুলে শিক্ষকতা করতে রাজি হতো না। সমস্ত শিক্ষক নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে স্কুলে যেতেন। যেমন স্কুলে দুইজন শিক্ষক থাকলে প্রত্যেকে তিনদিন করে স্কুল করতেন। তিনজন শিক্ষক থাকলে দুই দিন করে স্কুল করতেন। প্রতিদিন স্কুলে একজন মাত্র শিক্ষকই থাকতেন এবং তিনিই হাজিরা খাতায় প্রত্যেক শিক্ষকের নামে সই দিতেন। সেই শিক্ষকের হাতে ইয়া বড় একটা বেত থাকতো, তাই দিয়ে তিনি ছেলেগুলোকে ঠাণ্ডা করে রাখতেন। লেখাপড়া শেখার কাজে সেই স্কুল খুব একটা কাজে আসতো না ছাত্রদের।
