তবে আমার বড় চাচা খুব কর্তব্যপরায়ণ মানুষ। তিনি এসব পাহাড়ি লোকদের ভালোবাসতেন এবং তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে চাইতেন। তিনি খুব একটা স্কুল কামাই করতেন না। ডিগ্রি পাস করার পর আব্বুর হাতে কোন কাজ ছিল না তাই তিনি চাচাকে সাহায্য করতে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে স্কুলে কাজ করতে লাগলেন। কিন্তু এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে গেল। আমার এক ফুফুর বিয়ে হল সেই গ্রামে। তো সেই ফুফুর বাড়িতে একদিন তাদের এক আত্মীয় বেড়াতে এলেন। তার নাম নাসির পচা। লোকটা অনেকদিন সৌদি আরব ছিলেন এবং সেখানে নির্মাণ শিল্পে কাজ করে বেশ টাকা-কড়ি বানিয়েছিলেন। সেই নাসির পচা একদিন স্কুলে এসে আব্বুকে কাজ করতে দেখলেন। কথায় কথায় আব্বু তাকে বললেন যে, তিনি ডিগ্রি পাস করেছেন অল্পদিন আগে। জেহানজেব কলেজে ভর্তির চান্সও পেয়েছেন। তবে তিনি যে তার খরচ জোগাড় করতে পারছেন না—সে কথাটা তিনি গোপন রাখলেন।
নাসির পচা সব শুনে আব্বুকে বললেন, তাহলে আপনি আমাদের বাড়িতে এসে থাকুন না কেন! আমাদের বাড়ি থেকে জেহানজেব কলেজ বেশি দূরে নয়। এ কথা শুনে তো আব্বু আনন্দে আত্মহারা! তিনি আল্লাহ তায়ালাকে হাজার শুকরিয়া জানালেন। পচা তার দ্বিতীয় স্ত্রী জাজাইকে নিয়ে বাস করতেন স্পাল বান্দিতে। ভারি সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম। সেখান থেকে হোয়াইট প্যালেস দূরে নয়। আব্বু বলেন, হোয়াইট প্যালেস অত্যন্ত সুন্দর ও রোমান্টিক প্রাসাদ। তিনি বাসে চড়ে প্রায়ই এই প্রাসাদে যেতেন। আব্বুর গ্রামের তুলনায় হোয়াইট প্যালেস একটা বিশাল নগরীর মত। আব্বু সেখানে গেলে অভিভূত হয়ে পড়তেন। নাসির পচার বাড়িতে আব্বু খুব যত্নে ছিলেন। আব্বুর জীবনে জাজাই আমার মৃত দাদির স্থলাভিষিক্ত হলেন। প্রতিবেশীদের কেউ এসে যদি নালিস করত যে, আব্বু তার মেয়েকে নষ্ট করে দিচ্ছে তাহলে জাজাই তাকে বলতেন, ‘আমার জিয়াউদ্দিন ডিমের মত পরিষ্কার। তুমি বরং তোমার মেয়ের দিকে নজর রাখ।’
আমাদের গ্রামের থেকে স্পাল বান্দি গ্রামটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের। আমাদের গ্রামের মেয়েরা ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেত না কিন্তু সেই গ্রামের মেয়েরা ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। একেবারে পাহাড়ের চূড়ায় একটা জায়গা ছিল, যেখানে প্রতিদিন এই গ্রামের মেয়েরা একসঙ্গে বসে গল্পগুজব করত। মেয়েরা ঘরের বাইরে কোন স্থানে গিয়ে এভাবে আড্ডা জমাতে পারে- সেটা ছিল আমাদের সমাজে অচিন্তনীয়।
আব্বুর খুব ঘনিষ্ঠ একজন ছিলেন সেই গ্রামে, নাম তার আকবর খান। বিভিন্ন ব্যাপারে আব্বু তার পরামর্শ নিতেন। ভদ্রলোকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন ছিল না তবে যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন তিনি। নিজে কলেজে না গেলেও আব্বুকে টাকা দিতেন কলেজের খরচ বাবদ। আব্বু এই আকবর খান এবং নাসির পচার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন সব সময়। তারা দু’জনই লেখাপড়া জানতেন না তবে অন্যের শিক্ষার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ছিল অবিশ্বাস্য রকমের।
আব্বু কলেজে যাওয়া শুরু করলেন। সেই সময়টা পাকিস্তানের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। সেটা ছিল গরম কাল। আব্বু একদিন পাহাড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। এমন সময় তিনি খবর পেলেন, আমাদের স্বৈরশাসক জিয়াউল হক এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হলেন। লোকে বলাবলি করছিল, সেই বিমানে রাখা একটি আমের ঝুড়িতে বোমা পাতা ছিল। জিয়াউল হক নিহত হলে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। তাতে জয়লাভ করলেন জুলফিকার আলি ভুট্টোর কন্যা বেনজির ভুট্টো। জুলফিকার আলি ভুট্টোকে জিয়াউল হক যখন ফাঁসি দেন, তখন আব্বু বালক মাত্র। তার কন্যা যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন, তখন আব্বু কলেজে। বেনজির আমাদের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী শুধু নন, মুসলিম জাহানেরও প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং তার ভবিষ্যত্ নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হল সারা দেশে।
