গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুরে গতকাল বিকালে আন্দোলনরত গার্মেন্টস শ্রমিকদের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে বাদশা মিয়া ও রুমা আখতার নামে দুই শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরো নয় জন গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। আহতদের সাভারের এনাম মেডিক্যালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত বাদশা মিয়া (২৫) জিএমএস কারখানার শ্রমিক। রুমা আক্তারের বাড়ি রংপুরের কাউনিয়ায়।
উত্পাদিত মালের পিস রেট (উত্পাদন মজুরি) বৃদ্ধি এবং ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণের দাবিতে কাশিমপুর ও কোনাবাড়ি এলাকার কারখানা শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও ভাংচুরসহ আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। সোমবার ওই দুই শিল্প এলাকায় ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সকাল থেকেই ওই সব এলাকায় পুলিশ ও বিজিবির টহল জোরদার থাকায় শ্রমিকরা রাস্তায় নামতে পারেনি।
দুপুরের পর কাশিমপুরের সারদাগঞ্জ জিএমএস কারখানাসহ আশপাশের কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। তারা কাশিমপুর-শ্রীপুর সড়কে অবস্থান নিয়ে গাছের গুঁড়ি ও ইট ফেলে ব্যারিকেড দেয় এবং সড়কে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কয়েক দফা হামলা চালায়। এক পর্যায়ে কয়েক হাজার শ্রমিক জিএমএস কম্পোজিট নিটিং কারখানায় ব্যাপক ভাংচুর করে। একই সময়ে পাশের ডিবিএল গ্রুপের জিনাত টেক্সটাইলেও হামলা এবং ভাংচুর করে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
পুলিশ এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে শত শত রাউন্ড টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট ছোঁড়ে। শ্রমিকরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সারদাগঞ্জ এলাকায় শ্রমিকরা পুলিশকে ঘিরে ফেললে পুলিশ শ্রমিকদের হটাতে ব্যাপক রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল ছুঁড়ে। এতে ১০ শ্রমিক গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। আহতদের সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে গার্মেন্টস শ্রমিক বাদশা মিয়া ও রুমা আখতারকে (২২) চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কাশিমপুর-সারদাগঞ্জ সড়কের আশপাশের দোকানপাট ও বাড়িঘর ভাংচুর এবং কোথাও কোথাও অগ্নিসংযোগ করে। শ্রমিকদের হামলা ও মারমুখি আচরণে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ে। সংঘর্ষ চলাকালে পুরো সারদাগঞ্জ এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আতংকে লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটাছুটি করতে থাকে।
এদিকে কোনাবাড়ি জরুন এলাকার স্টান্ডার্ড, ইসলামসহ আশপাশের এলাকার শ্রমিকরা বিকালে জড়ো হয়ে কোনাবাড়ি-কাশিমপুর সড়কে মিছিল করে। তারা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে পুলিশ বাধা দেয়। এক পর্যায়ে সেখানেও সংঘর্ষ বাধে। পরে পুলিশ টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট ছোঁড়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।
এনাম মেডিক্যাল কলেজ সূত্র জানায়, গুলিবিদ্ধ ৯ জনকে ভর্তি করে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। তারা হলেন, সাবিনা (২২), শিমুল (১৪), শরীফ (২৩), আমির হামজা (৩৩), জাবেদ (২৮), শফিকুল ইসলাম (২২), মো. আক্তার হোসেন (২২). জসিম (২৬) ও শাহজাহান মিয়া (২৫)।
জিএমএস কম্পোজিট নিটিং লিমিটেডের এক কর্মকর্তা জানান, দুপুরের খাবারের বিরতির পর শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভ ও ভাংচুর শুরু করে। তারা কারখানা ভবনের কাঁচ, মেশিনপত্র, অফিসের আসবাবপত্র, কম্পিউটার, তিনটি মাইক্রোবাস, দুইটি প্রাইভেটকার, একটি জিপ ভাংচুর করে। একই সময়ে আশপাশের কারখানার শ্রমিকরাও তাদের সাথে যোগ দেয়। পরে হাজার হাজার শ্রমিক জড়ো হয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে পাশের ডিবিএল গ্রুপের জিনাত টেক্সটাইল ভাংচুর করে। ভাংচুরে কারখানার কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন।
স্থানীয় চক্রবর্তী ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সাইফুল ইসলাম জানান, শ্রমিকরা দুপুরের পর থেকেই বিক্ষোভ, ভাংচুর ও সড়ক অবরোধ করে আতংক সৃষ্টি করে। কারখানা ভাংচুরের পর বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের তাণ্ডব নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল ছোঁড়ে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় জানান, দুপুর পর্যন্ত ওইসব এলাকার পরিস্থিতি শান্ত ছিল। পরে শ্রমিকরা ভাংচুর ও তাণ্ডব শুরু করলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক রাউন্ড টিয়ার সেল ও শট গানের গুলি করে। এতে কয়েক শ্রমিক আহত হয়ে থাকতে পারে।
সর্বশেষ, রাত সোয়া ৭টা পর্যন্ত সারদাগঞ্জে শ্রমিকদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছিল।
