হঠাত্ মিতুলের ঘুম ভেঙে যায়। চারদিক অন্ধকার। তবে ঘরের বাইরে একটা বাতি জ্বলছে। বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলে দেখতে পায় চারদিক নিঝুম চুপচাপ। মনে হয় অনেক রাত। এখন রান্নাঘরে নিশ্চয় পাতিল ভূত আসবে। একটা মোমবাতি দরকার। কি আশ্চর্য, সামনে টেবিলেই একটা মোমবাতি আর দেশলাই পায় সে। মোমবাতি জ্বালিয়ে মিতুল ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে যায়। খুব সাবধানে রান্নাঘরের দরজাটা খোলে। তারপর মোমবাতিটা সামনে উঠিয়ে দেখার চেষ্টা করে কেউ আছে কিনা। প্রথমে কিছু দেখতে পায় না মিতুল। একটু পরেই দেখে দুটো বড় পাতিলের পেছন থেকে আস্তে আস্তে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে চারটা পাতিল ভূত। গোল গোল চোখ করে মিতুলের দিকে তাকিয়ে আছে ভূতগুলো। মিতুল ভয় পায় না। কারণ ভূতগুলোর চেহারা ভয় পাবার মতো নয়। হামটি ডামটির মতো চেহারা। মিতুল জিজ্ঞেস করে, ‘তোমরা কি পাতিল ভূত’। এই কথা বলার সাথে সাথে লাফ দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তারপর একজন আর একজনের কানে কি যেন বলে। সবচাইতে বড় ভূতটা একপা সামনে এগিয়ে এসে বলে, ‘হ্যাঁ আমরা পাতিল ভূত। কিন্তু তুমি কে?’
‘আমি কে?’ মিতুল সাহস পায়। ‘আমি হচ্ছি মিতুল। ঢাকায় থাকি। আমার ছোটমামাকে তো চেনো। তিনি বলেছেন তোমাদের কথা। তাই তোমাদের দেখতে এসেছি আমি। ‘মিতুলের কথা শুনে বড় ভূতটা অন্য ভূতগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘ছোট মামা। ছোট মামা।’ সাথে সাথে সব ভূতগুলো একসাথে বলতে থাকে ‘ছোট মামা, ছোট মামা’। মিতুল রেগে যায়। একটা ধমক দেয়, ‘এই থামো। কি শুরু করেছো’।
ধমক দেয়ার সাথে সাথে ভূতগুলো একেবারে চুপ। নড়াচড়াও বন্ধ। মিতুল মোমবাতি নামিয়ে রেখে বলে, তোমরা ভাত খেয়েছো? চারটা ভূত একসাথে মাথা নাড়ে।
এখন তোমরা কি করবে?
আমরা এখন বাসায় যাবো?
বাসা কোথায়?
পুকুর পাড়ে যে বড় তালগাছগুলো আছে তার উপরে।
কি করে যাবে? ভূতগুলো হেসে উঠে খি খি করে। তারপর বলে, কেন উড়ে চলে যাবো। তুমি যাবে আমাদের সাথে? তোমাকেও নিয়ে যেতে পারি। মিতুল একটু ভয় পায়। তবু বলে, আমি আবার আসবো কিভাবে? ভূতগুলো খুশি হয়। বড় ভূতটা বলে, তুমি আমাদের বন্ধু। তোমাকে আবার দিয়ে যাবো আমরা। কি যাবে? মিতুল কি মনে করে বলে, যাবো। সাথে সাথে ভূতগুলো মিতুলকে ঘিরে নাচতে থাকে। তারপর চারজন মিলে মিতুলকে উঠিয়ে উড়ে যেতে থাকে। মিতুল অনেক উপরে উঠে যায়। তার ভয় লাগে না। খুব মজা লাগে। আকাশে অনেক তারা দেখতে পায়। গাছপালার অনেক উপর দিয়ে তারা উড়ে যেতে থাকে। বড় ভূতটা বলে, কেমন লাগছে বন্ধু।
খুব মজা লাগছে। কিন্তু আমরা এখন কোথায়? নিচে এতো আলো কিসের?
আমরা এখন ঢাকার গুলিস্তানের উপর। মিতুল চমকে উঠে।
বলো কি? কিন্তু গ্রামে যাবো কিভাবে?
কোন ব্যাপারই না। বড় ভূতটা বলে। নিমেষে চলে যাবো। ভূতগুলো মিতুলকে নিয়ে আরও ঘুরে বেড়ায়। তারপর বলে, সর্বনাশ। ভোর হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি তোমাকে দিয়ে আসতে হবে।
ভূতগুলো ঝড়ের বেগে যেতে থাকে। একসময় বলে, তোমার বাড়ি এসে গেছে। তোমাকে আমরা তোমার বাড়ির উপর ফেলে দিচ্ছি। আমাদের সময় নেই নিচে নামার।
মিতুল চিত্কার দিয়ে উঠে- কি বলছে? আমার হাত-পা তো ভেঙ্গে যাবে। কিছু হবে না। ঐ যে খড়ের গাদা আছে সেখানে। ভূতগুলো অনেক নিচে নেমে এলো। তারপর মিতুলকে খড়ের গাদার ওপর ছেড়ে দিল। মিতুল ভয় পেয়ে চেঁচাতে লাগলো, ছোটমামা, ছোটমামা, আমি পড়ে যাচ্ছি, আমি পড়ে যাচ্ছি। ছোটমামার গলা শুনতে পায় সে। মামা বলছে, ‘কিরে তোর কি হইলো। ঘুমের মধ্যে চিল্লাচ্ছিস কেন?’ চোখ খুলে মিতুল দেখে সে তার ছোটমামার কোলে। সে কি তবে স্বপ্ন দেখছিল? মামা আবার বলে, ‘কিরে তোর ঘুম ভাঙ্গছে’?
মামা পাতিল ভূত আমাকে ফেলে দিয়েছে। ছোটমামা মিতুলকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বলে, ‘তোরে নিয়া আর পারা যায় না। কোথায় তোর ভূত। ভুত আবার আছে নাকি?’ মিতুল অবাক হয়ে বলে, তুমি যে বলো ভূত দেখেছ।
আরে দূর ঐসব মিছা গল্প।
শুধু গল্প।
আরে হ্যাঁ। শুধুই গল্প। মিতুল গম্ভীর গলায় বলে, মামা তোমার গল্প আর শুনবো না।
কেন শুনবি না কেন? আমি আবার কি করলাম। মিতুল কথা না বলে মার ঘরের দিকে যায়। যেতে যেতে ভাবে তার আর কোনদিন ভূত দেখা হবে না।
