নিঝুম দ্বীপের হাতছানি

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:০০
প্রকৃতির অভয়ারণ্য নিঝুম দ্বীপ। যা ভ্রমণ পিপাসু পাখি ও প্রকৃতি প্রেমিদের একটি দর্শনীয় স্থান। এ দ্বীপে চারদিক ঘিরে রয়েছে কেওড়া ও গেওয়া বন। বনে রয়েছে মনোরম প্রকৃতি, বিচিত্র পাখির কুহুতান আর ভিতু সোনালী হরিণের দল। দিন শেষে সন্ধ্যা এলেই এসব হরিণের শুরু হয় হাঁটাচলা। মনের অজান্তেই চোখে পড়বে বিচরণশীল হরিণ দল। রাতের নির্জনতায় উপভোগ করতে পারো শিয়ালের হুক্কাহুয়া। সাগর নদীর মোহনায় ভেসে থাকা এক জলকন্যা নিঝুম দ্বীপ। সবুজের সমারোহে ভরপুর এ দ্বীপে রয়েছে ছোট ছোট সবুজ ঘাস, লতাগুল্ম আর ফনীমনসার ঝোপ। গভীর অরণ্যে বয়ে চলা খালে রয়েছে অথৈ জলরাশি। তাই জোয়ারে ভিজে থাকা বালুচরে চিকচিক করে সূর্যালোক। বিকেলে নৌকায় চড়ে খালের বুকে যখন ঘুরতে বেরোবে চোখে পড়বে মায়াবী হরিণের পলক। আর হাতছানি দিয়ে ডাকবে বিকেলের নিকেলকরা রোদ। খালের বুকে ভাটা আসে দিনে দু’বার। জোয়ারের জলরাশি ফেলে যায় কাদামাখা বালি। নরম আলুথালু পানিতে ভিড় করে রঙিন পাখিরা। মাছ আহরণে পেটপুরে আবার ঘরে ফিরে। প্রকৃতির মনোরম এ দ্বীপটি বাংলাদেশের নোয়াখালী হাতিয়া উপজেলায় অবস্থিত। আয়তনে প্রায় ১৪,০০ একর। ১৯৯৬ সালের হিসেব অনুযায়ী দ্বীপটি বিস্তৃত ৩৬৯৭০.৪৫৪ হেক্টর এলাকা জুড়ে। বাংলাদেশে বন বিভাগ ৭০ দশকে বন বিভাগের কার্যক্রম শুরু করে পরীক্ষামূলকভাবে চার জোড়া হরিণ ছাড়ে। ১৯৯৬ সালে হরিণের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২,০০০। এছাড়াও এ দ্বীপ বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে পরিচিত। এ দ্বীপের নামকরণে রয়েছে একটি ইতিহাস। ১৯৫০ সালে এ দ্বীপে কোনো জনবসতি ছিল না। তাই নিঝুম দ্বীপ বলেই পরিচিতি ছিল। পরবর্তীতে মহিষের বাথান নিয়ে প্রথম বসতি স্থাপন করেন ওসমান নামক এক ব্যক্তি। ১৯৭৪ সালে হাতিয়ার তত্কালীন সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম কালাম মূলত বল্লারচর, চর ওসমান, কামলার চর এবং চরমুরি এ চারটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এ দ্বীপের নামকরণ করেন নিঝুম দ্বীপ। নিঝুম দ্বীপে কোনো হিংস্র প্রাণী নেই। বনের মাঝে চোখে পড়বে চিত্রা হরিণ কিংবা মহিষের বসবাস। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ৩৫ হাজার পাখি। শীত মৌসুমে ভীড় করে নানান প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। দ্বীপের বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে পলিমাটির চর। যা জোয়ারে তলিয়ে যায় এবং ভাটায় জেগে ওঠে। পলিমাটির নরম কাদায় চোখে পড়বে শুভ্র শরত্ বকের দল। আর এসব পাখিদের একমাত্র খাদ্য খালের বুকে ছুটে চলা মাছ। মারসৃপারি নামে এক ধরনের উভচর প্রাণী হিসেবে পরিচিত এক ধরনের মাছ। পাঁচবছর পর্যন্ত এ মাছ বেঁচে থেকে ৬-৯ ইঞ্চি লম্বা হয়। বর্ষা মৌসুমে ইলিশের জন্য বিখ্যাত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাছ ব্যবসায়ীরা এ দ্বীপে মাছ কিনতে আসে। শীত পরবর্তী মৌসুমে চেউয়া মাছের জন্য বিখ্যাত এ দ্বীপ। জেলেরা এসব মাছ শুঁটকি তৈরি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারজাত করে। এ শুঁটকি ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩০-৩৫ টাকা কেজি বিক্রি হয় এবং হাঁস-মুরগির খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার হয় এ সব শুঁটকি। উদ্ভিদ প্রণালী হিসেবে রয়েছে কেওড়া ও গেওয়া গাছ। এছাড়াও রয়েছে ৪৩ প্রজাতির লতাগুল্ম এবং বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরাজি। এ দ্বীপে অধিবাসীরা জীবননির্বাহ করে মাছ শিকার এবং বনের মধু সংগ্রহ করে। জেলেরা নদীতে মাছ ধরে। মাছ বিক্রি করে। কথিত আছে এসব জেলেরা জাহাজমারা থেকে এসে এখানে মাছ শিকারের আশায় বসতি স্থাপন শুরু করে। নদী, নৌকা এবং মাছের সাথে গড়ে ওঠে গভীর সখ্যতা।