প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণের ভাগ্য নিয়ে ভবিষ্যতে আর কাউতে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না। সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা সংবিধান সংশোধন করে জনগণকে সকল ক্ষমতার অধিকারী করেছি। জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের সরকার নির্বাচন করবে- এটাই তাদের সাংবিধানিক অধিকার।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা পৌনে ২টার দিকে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার রামনাবাদে দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর ‘পায়রা সমুদ্র বন্দর’ উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। কলাপাড়ার সুধী সমাবেশ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকাল সোয়া ১১টায় বরগুনার বামনায় ও বিকাল সাড়ে তিনটায় তালতলীতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত দুটি জনসভায় বক্তৃতা করেন।
গতকাল বেলা পৌনে ১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে কলাপাড়া রামনাবাদ হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন। পরে রামনাবাদ চ্যানেলে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জন্য এভিয়েশন সুবিধা সম্বলিত ‘বানৌজা শের-ই-বাংলা ঘাঁটি’-এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ও পায়রা বন্দর এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, পায়রা সমুদ্র বন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এই বন্দর জেটিতে সরাসরি মাদার ভেসেল ভিড়তে পারবে। চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় আরো দ্রুত গতিতে ও স্বল্প সময়ে এখানে পণ্য খালাস করা সম্ভব হবে। এই বন্দর নির্মাণের ফলে এ অঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।
বার বার নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়ী করায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন আসছে। আশা করি আপনারা নৌকা মার্কাকে ভুলে যাবেন না। তিনি তার সরকারের আমলে এ এলাকার ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নৌবাহিনীকে আধুনিক ও ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে খুব শীঘ্রই সাবমেরিন সংযোজিত হতে যাচ্ছে। দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দরের পাশে স্থাপিত এই স্বয়ংসম্পূর্ণ নৌ-ঘাঁটিতে নৌ কমান্ডো, এভিয়েশন, জাহাজ ও সাবমেরিন বার্থিং সুবিধা থাকবে। এই ঘাঁটির মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সুন্দরবন ও তত্সংলগ্ন এলাকায় অপরাধ দমন সহজ হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে জনগণের জানমাল রক্ষায় নৌ ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ৫০০ একর জমির উপর এই নৌ ঘাঁটি হবে।
সমুদ্র বন্দর ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী একইসাথে উদ্বোধন করেন পটুয়াখালীর মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, শিশু একাডেমী কমপ্লেক্স ভবন ও বাউফল উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। এছাড়া কলাপাড়ার রামনাবাদ নদীর উপর শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু, পটুয়াখালীর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ভবন ও বাউফল থানা ভবনেরও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি।
সমুদ্র বন্দর উদ্বোধন উপলক্ষে সকাল থেকে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার লোক সমাগম ঘটলে সুধী সমাবেশ কার্যত জনসভায় পরিণত হয়।
নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের সভাপতিত্বে সুধী সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পায়রা সমুদ্র বন্দরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়ার এডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ। অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান এমপি, জাতীয় সংসদের হুইপ ও নৌ-মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম চৌধুরী, নৌ-বাহিনী প্রধান ভাইস এডমিরাল এম ফরিদ হাবিব ও নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।
এর আগে রামনাবাদ হেলিপ্যাডে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান নৌবাহিনী প্রধান এম ফরিদ হাবিব এবং চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আহমেদ। কলাপাড়ার কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে করে বরগুনার তালতলীতে যান।
বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত দেশের
কল্যাণ চায় না : বামনায় প্রধানমন্ত্রী
ইত্তেফাকের বরগুনা (উত্তর) প্রতিনিধি জহিরুল হাসান বাদশা ও বামনা সংবাদদাতা হাবিবুর রহমান জানান, বরগুনার বামনা সারওয়ারজান পাইলট স্কুল মাঠে গতকাল বেলা সোয়া ১১টায় বামনা উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত দেশের কল্যাণ চায় না, তারা হরতাল দিয়ে মানুষ হত্যা করে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশের মানুষ শান্তিতে থাকে, দুই বেলা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ অরাজকতা চায় না, তারা ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় নেবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসলে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একটি করে কলেজ সরকারি করা হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে জাতীয় শিক্ষানীতিমালা প্রণয়ন করেছে। তিনি বলেন, কওমী মাদ্রাসার কারিক্যুলাম ঠিক করে দিতে একটি কমিশন গঠন করে দেয়া হয়েছে। সরকার একটি কর্তৃপক্ষ ঠিক করে দেবে। সেই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সনদ বিতরণ হবে, এটা কোনো বাধ্যতামূলক নয়। যদিও এতে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত আছে; কিন্তু তিনি আশাবাদী যে, আগামীতে সবাই একমত হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময় বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের সকল মানুষের ধর্ম পালনের সমান সুযোগ থাকবে। শেখ হাসিনা তার ২৮ মিনিটের বক্তব্যে বর্তমান সরকারের আমলে নেয়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে আগামী নির্বাচনে পুনরায় নৌকায় ভোট চান।
বামনা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি হারুন-অর-রশিদ-এর সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ও মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, তোয়ায়েল আহমেদ, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, হুইপ নূরে আলম চৌধুরী, স্থানীয় সংসদ সদস্য হাসানুর রহমান রিমন ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার টুকু। প্রধানমন্ত্রী এর আগে বামনায় ১৪টি উন্নয়নমূলক কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
সভায় আমির হোসেন আমু বলেন, বিএনপি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর টাকায় এ দেশে মানুষ হত্যার মতো অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। তারা পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিরোধী দল নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। তিনি বিরোধী নেত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ষড়যন্ত্র করবেন না, কোনো লাভ হবে না, নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে হবেই। সকাল ১১টা ৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী বামনা শহরের নতুন বাজার হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন।
বিএনপি নেত্রী দেশ ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে
লিপ্ত : তালতলীতে প্রধানমন্ত্রী
ইত্তেফাকের আমতলী (বরগুনা) সংবাদদাতা শাহাবুদ্দিন পান্না জানান, গতকাল বিকাল সাড়ে তিনটায় বরগুনার তালতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি নেত্রী দেশ ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন; কিন্তু তার আশা পূরণ হবে না। তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রীকে আমি সংলাপের জন্য ফোন করেছি; কিন্তু আমার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য হরতাল দিয়ে তিনি ভাঙচুর শুরু করলেন। হরতালের সময় ২০ জন মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। হরতালের নামে মানুষ হত্যার দায় বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াকেই নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য এ অঞ্চলে একটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। তিনি তার সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে দেশের কোনো উন্নয়ন করে নাই। শুধু লুটপাট করেছে।
তালতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুল হক জমাদ্দারের সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, নৌ মন্ত্রী শাজাহান খান, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, ইসাহাক আলী খান পান্না, বরগুনা আওয়ামী লীগ সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু প্রমুখ।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে তালতলীতে এসে পৌঁছান। ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ও ফজলুল হক জমাদ্দার সেখানে তাকে স্বাগত জানান।
জনসভাস্থলে বসে প্রধানমন্ত্রী বরগুনার সার্ভার স্টেশন, তালতলী উপজেলার দক্ষিণ ঝাড়াখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবন, বরগুনা মহিলা কলেজের একাডেমিক ভবন ও তালতলীর টেংরাগিরি ইকোটুরিজমের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের উদ্বোধন এবং তালতলী উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন, বরগুনা সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ, বরগুনা-তালতলী-সোনাকাটা সড়ক, বরগুনা জেলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আমতলী উপজেলার থানা ভবনসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
ভিডিও কনফারেন্সে চাঁদপুরে
উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন আজ
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বুধবার সকালে ভিডিও কনফারেন্স-এর মাধ্যমে চাঁদপুরে ১৬’শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৩টি প্রকল্পে ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করবেন। চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মো: ইসমাইল হোসেন এ খবর নিশ্চিত করেছেন। চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের সন্মেলন কক্ষে এই ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হবে।
