বিএনপি অংশ না নিলে পশ্চিমা বিশ্বে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৩, ২৩:২১
আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার জোটভুক্ত দলগুলো অংশগ্রহণ না করলে পশ্চিমাদের মূল্যায়ন কেমন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে রাজনীতিজ্ঞ ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকারের উচিত হবে ক্ষুদ্রদলগুলোকে নির্বাচনে আনতে অতি মনোযোগী না হয়ে প্রধান বিরোধীদলকে নির্বাচনে আনার উদ্যোগ নেয়া। সেজন্য সরকারকেই পরিবেশ তৈরি করতে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটবে কিনা তা নিয়েও আশঙ্কা রয়েছে। দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে এমনটাই মত দিয়েছেন রাজনীতিজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। ঐ নির্বাচনে বিএনপি অপেক্ষাকৃত কম আসন পেলেও তাদের মোট ভোটপ্রাপ্তির হার অনেক বেশি ছিল। আধুনিক গণতন্ত্রে কোনো দেশের প্রধান বড় দুইটি দল নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করলে ঐ নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। বাংলাদেশেও আসন্ন দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ গ্রহণ না করলে পশ্চিমা বিশ্বসহ পৃথিবীর অনেক দেশে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে না আসলে নির্বাচিত সরকারেরও নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, দেশে বিএনপি একটি বড় দল। সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশভাবে জয়ী হয়েছে। জনমত জরিপেও তাদের দিকে পাল্লা ভারি। তারা নির্বাচনেও যেতে চায়। কিন্তু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে সন্দিহান রয়েছে। বর্তমান অবস্থায় কারচুপির ভয় করছে। এজন্য ভরসা চায়। সরকারের কাছে তারা সেই নিশ্চয়তা চাইতেই পারে। কিন্তু তা পাচ্ছে না বলেই শঙ্কা। এ শঙ্কা থেকে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন উঠবে। যদিও এক্ষেত্রে ভারত ও পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তিনি বলেন, যে ব্যবস্থাতেই নির্বাচন হোক না কেন, তাতে যদি প্রধান বিরোধীদল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তা জনমতের সঠিক মতের প্রতিফলন ঘটাবে না। ঐ নির্বাচনের সাংবিধানিক ভিত্তি থাকলেও নৈতিক ভিত্তি থাকবে না। পশ্চিমা বিশ্ব নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলে মনে করবে না। ফলে জবরদস্তি করে নির্বাচন করার চেষ্টা হলে রাষ্ট্রে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, বিএনপির অনেক কর্মী-সমর্থকও রয়েছে। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও নিষ্ক্রিয় থাকবে না। দেশে বিশৃংখলা হবে। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার বিতর্কিত হবে এবং দেশ পরিচালনা করা তাদের জন্য অনেক কঠিন হবে। সরকার যতই জবরদস্তি করুক, তাতে ইতিবাচক ফল আসবে না বরং জনদুর্ভোগ বাড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। পশ্চিমা বিশ্বসহ পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশ এ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন যে ব্যবস্থায়ই হোক না কেন পশ্চিমা বিশ্ব গভীরভাবে তা পর্যবেক্ষণ করবে। বরং আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। তিনি বলেন, সরকার নিজের মত সরলীকরণ করে নির্বাচন করলে তা টিকতে নাও পারে। এ পদক্ষেপ রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক হবে। জাতীয় পার্টি বা অন্য যে দলই নির্বাচনে আসুক না কেন, বিএনপি না এলে তা হবে বিতর্কিত। জনগণের রায়ের অপব্যবহার ও তামাশা। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রতিরোধ আসবে। অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান বলেন, দেশের নির্বাচন ও রাজনীতিতে বিএনপি মেজর ফ্যাক্টর। একে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়বে। তাই গণতান্ত্রিক দেশগুলোও বাংলাদেশের প্রতি নজর রাখছে। রাজনীতি পর্যবেক্ষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, দেশের মানুষকে শান্তি দেয়ার ও শান্তিতে রাখার প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে অন্য গণতান্ত্রিক দেশেরও পর্যবেক্ষণ থাকে। দুইদিক বিবেচনা করলেই দেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি ছাড়া নির্বাচন হতে পারে না। তবে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপি অনাস্থায় ভুগছে। তাই তাদেরকে আস্থায় আনার দায়িত্ব সরকার তথা আওয়ামী লীগের। তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে তা অসম্পূর্ণ হবে। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। এ দল নির্বাচনে না এলে দেশে ও দেশের বাইরে প্রশ্ন তৈরি হবে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে বাংলাদেশ বড় ফ্যাক্টর হবে। কেননা গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে দেশে সংঘাত দানা বাধতে শুরু করবে। আঞ্চলিক কোনো শক্তির যত সমর্থনই থাকুক সংকট দানা বাধতে শুরু করবে।