চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণ করে সবদলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়নের দাবির পাশাপাশি সংসদ ভেঙে দেয়ার যৌক্তিকতা রাষ্ট্রপতিকে তুলে ধরেছেন নির্বাচন কমিশনাররা। গতকাল বিকালে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল হামিদের সাথে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যর একটি প্রতিনিধি দলের বৈঠকে এই অনুরোধ করা হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার সবদলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেন। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে সংসদ ভেঙে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানান কমিশনাররা।
বৈঠকে ইসি রাষ্ট্রপতিকে জানায়, আচরণ বিধির পরিবর্তন সত্ত্বেও আগামী নির্বাচনে সংসদ বহাল থাকলে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ রাখা যাবে না। আচরণবিধি কার্যকর করাটা কঠিন হয়ে যাবে। বিরোধী দলসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী থেকে নির্বাচনের সময় অভিযোগের পাহাড় জমা হবে; কিন্তু কমিশনের কিছু করার থাকবে না। এজন্য তফসিল ঘোষণার আগেই সংসদ ভেঙে দিলে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা সহজ হবে। নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেও এটা ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাচন কমিশনার ইত্তেফাককে জানান, নির্বাচনের আগে সংসদ বিলুপ্তির যুক্তি রাষ্ট্রপতিকে বলা হলেও তিনি সরাসরি কোন মন্তব্য করেননি। তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।
বৈঠকে নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলার বিষয়েও কথা বলেছে ইসি। এজন্য রাষ্ট্রপতির সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, বিগত নির্বাচনে যেভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে সেভাবে আগামীতেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা চাওয়া হয়।
বৈঠকে নির্বাচনের তফসিলের বিষয়ে কমিশনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। সংবিধান মোতাবেক ২৪ জানুয়ারির আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চায় কমিশন। এ ক্ষেত্রে চলতি মাসের একদমই শেষ অথবা ডিসেম্বরের ১ অথবা ২ তারিখে তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। এ হিসেবে কমিশনের পছন্দ জানুয়ারির ৯, ১৬ অথবা ১৮ তারিখে নির্বাচন। ব্যতিক্রম ঘটলেও এর কাছাকাছি কোনো তারিখ ভোটগ্রহণের জন্য নির্ধারণ করা হবে। এর কারণ হিসাবে সাংবিধানিক তিন অনুচ্ছেদের কারণে সংসদের মেয়াদ শেষের এক সপ্তাহের মধ্যে তারা নির্বাচন আয়োজনের কথা রাষ্ট্রপতিকে বলেন। তবে রাষ্ট্রপতি এক্ষেত্রে কোনো নির্দেশনা দেননি। সার্বিক বিষয়ে প্রস্তুতি সম্পন্নের পর কমিশনের সভায় তফসিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছে কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্রটি। এছাড়াও রাষ্ট্রপতিকে ইসির সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রস্তুতির বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে আচরণবিধির সংশোধন, ভোট কেন্দ নির্ধারণ, ভোটারদের সর্বশেষ সংখ্যা ইত্যাদি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সার্বিক বিষয়ের সঙ্গে তুলনামূলক বর্তমান কমিশনের প্রস্তুতি এবং অগ্রগতির বিষয়েও রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করা হয়েছে।
এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে বিকাল সাড়ে তিনটায় কমিশনাররা বঙ্গভবনে পৌঁছান। এরপর নির্ধারিত সময় বিকাল ৪টার ১০ মিনিট আগেই বৈঠক শুরু হয়। বিকাল পাঁচটা ২০ মিনিটে বৈঠক শেষ হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মোবারক, মোহাম্মদ আবু হাফিজ, মো. শাহ নেওয়াজ ও ইসি সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নেপালে অবস্থান করায় তিনি এই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন নি।
সিইসির প্রেস ব্রিফিং
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্ শেষে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে সিইসি কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমরা প্রস্তুত। রাষ্ট্রপতিকে আমরা সেটা অবহিত করেছি। আমরা চাই সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে। আমরা রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেছি তিনি যেন এ বিষয়ে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।’
রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ চেয়েছেন উল্লেখ করে সিইসি বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ একটি সুন্দর সমাধান হবে বলে আমরা মনে করি। তাই এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানিয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা আগামী জাতীয় নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেছি এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিয়েছি। আমরা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির কাজ করে যাচ্ছি।
যথা সময়ে তফসিল ঘোষণা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের অভিভাবক হিসেবে প্রতিবারের মতো এবারও জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে জানাতে ও তফসিলের তারিখ চূড়ান্ত করতে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত্ করে। একইসাথে যথাসময়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
