শুনানিতে প্রাধান্য পায়
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম
গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ
সংখ্যালঘু নির্যাতন, হরতালে মানুষ হত্যা
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের অনড় অবস্থানের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপ-কমিটি। বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত পৌনে তিনটায় ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত এই শুনানিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ছাড়াও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও হামলা, হরতালে রাজপথে মানুষ হত্যা ও সহিংসতা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম এবং গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপসহ বেশ কয়েকটি বিষয় প্রাধান্য পায়।
কংগ্রেসের পররাষ্ট্র-বিষয়ক উপ-কমিটির (এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল) চেয়ারম্যান স্টিভ শ্যাবটের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শুনানিতে কংগ্রেস সদস্য ব্র্যাড শারমেন, তুলসি গ্যাবার্ড ও জেরার্ড ই কোনোলি বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন। পরে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের পাবলিক পলিসি স্কলার আলী রীয়াজ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) এ এন এম মুনীরউজ্জামান ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর জন শিফটন।
প্রায় দেড় ঘণ্টা স্থায়ী ‘বাংলাদেশ ইন টারময়েল: এ নেশন অন দ্য ব্রিঙ্ক?’ শীর্ষক এই শুনানিতে স্টিভ শ্যাবট তার অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ওই সফরের সময় বিরোধী দল বিএনপির ডাকে সহিংস হরতাল চলছিল। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে বৈঠকে অবাধ, সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়েছেন। শ্যাবট বলেন, তাদের দুজনকেই নিজেদের অবস্থানে অনড় মনে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনে করেন, অবাধ নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা রয়েছে। আর বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি বিরোধী দল নির্বাচনে যাবে কি না। শ্যাবট বলেন, হরতালের সময় সহিংসতা বন্ধের জন্য তিনি দুই নেত্রীকে অনুরোধ করেছেন। সহিংসতা বন্ধ না হলে তা অস্থিতিশীলতাকে উসকে দেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শুনানিতে তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম, গ্রামীণ ব্যাংক এবং শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. আলী রীয়াজ বলেন, দুই দলের অনড় অবস্থানের কারণে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে বিরোধী দলের দাবি মেনে নিয়ে সংকট উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তবে তিনি মনে করেন, প্রধান বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করলেও পরিস্থিতি ’৮৮ ও ’৯৬-এর চেয়ে আলাদা। তিনি বর্তমান সংকট সমাধানের উপায় হিসাবে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ওপর মত দেন। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হলেও দুই দলের বৈরিতা কমানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট দূর করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া এবং ধর্মীয় মৌলবাদ মোকাবিলায় ভারতের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দূর করা উচিত বলে মতামত ব্যক্ত করেন আলী রীয়াজ।
এ এন এম মুনীরউজ্জামান বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক সংঘাত অব্যাহত থাকলে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। আর এ পরিস্থিতি জঙ্গিবাদের উত্থানে মদদ যোগাবে। চূড়ান্ত বিচারে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা প্রসঙ্গে জেনারেল মুনীরুজ্জামান বলেন, সেনাবাহিনীর এ ধরনের কোনো ইচ্ছা নেই। তবে সহিংসতা অব্যাহত থাকলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোনো এক পর্যায়ে তাদের ভূমিকা নিতে দেখা যেতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা সমীচীন হবে না বলে মত দেন তিনি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক জন শিফটন বাংলাদেশকে এখনই জিএসপি-সুবিধা না দেওয়ার পরামর্শ দেন।
প্যানেল আলোচনা শেষে শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব। মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান এড রয়েসের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ শুনানি। রয়েস তার বক্তব্যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সামপ্রতিক হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শুধু হিন্দু সমপ্রদায় নয়, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও নাস্তিক লোকজনের ওপর হামলা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মাদ্রাসা শিক্ষা বাংলাদেশে পাকিস্তানের মতো মৌলবাদে মদদ যোগাচ্ছে কী না কিংবা এ সমস্যা কতটা প্রকট তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শুনানিতে দর্শক সারিতে উপস্থিত ছিলেন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদেরসহ দূতবাসের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ড. শাহজাহান মাহমুদ, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ডা. মুজিবুর রহমান মজুমদার, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও মূলধারার রাজনৈতিক গিয়াস আহমেদ, বিএনপি নেতা শরাফত হোসেন বাবু, ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার, ইন্টারন্যাশনাল ব্রডকাস্টার সেলিম হোসেন, সাপ্তাহিক ঠিকানার প্রেসিডেন্ট সাঈদ-উর-রব, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান, আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের নেতা হাসানুজ্জামান হাসান, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা শীতাংসু গুহ প্রমুখ।
