বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৩, ২০:০৬
সমস্যাটা ছেলে শিশুদের নিয়ে নয়। চট্টগ্রামে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কন্যা শিশুদেরই শিকার হতে হচ্ছে বাল্য বিবাহের। ভাবতে অবাক লাগে, যখন সমাজ একদিকে নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের কথা ভাবছে, তখন সবার চোখের আড়ালে সমাজের কিছু বিবেকহীন মানুষ নেতৃত্বকে হাত করে তাদের পরিবারের ছোট্ট শিশু কন্যাটিকে প্রাপ্তবয়স্ক কোনো পুরুষের কাছে বিয়ে দিয়ে কন্যাদায়ের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাইছে। চট্টগ্রামে এই বাল্য বিবাহ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও রয়ে গেছে প্রথা হিসাবে। যারা কন্যা শিশুদের বাল্য বিবাহ নামের কুপ্রথার যূপকাষ্ঠে বলি দিচ্ছে, তারা জানে এটি একটি শাস্তিযোগ্য বে-আইনী কাজ। আর সে জন্যই তারা মহানগরী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ কাজটি করছে অত্যন্ত গোপনে। বয়স গোপন করে, লুকিয়ে, এক শ্রেণির ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকে লোভ দেখিয়ে ইতিমধ্যে বহু অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যা শিশুর বিয়ে দিয়ে তারা পার পেয়ে গেছে। অন্যদিকে সেইসব কন্যা শিশু অকাল মাতৃত্ব, অকাল বৈধব্য, অপুষ্টি ও দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তাদের জীবনের সব সম্ভাবনাকে দিয়েছে জলাঞ্জলি। দারিদ্র্য, পারিবারিক গঞ্জনা ও স্বাস্থ্যহানির অভিশাপ নিয়ে হয়ে দাঁড়াচ্ছে সমাজ সংসারের বোঝা। যারা বিয়ে দিয়ে, বিয়ের গীত গেয়ে, নেচে-মেতে বিয়ের ব্যয়বহুল ভোজের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সামন্ত প্রথায় বালিকা বধূটিকে আশির্বাদ-দোয়া করে গিয়েছিলো, তারা দুর্দশাগ্রস্ত হতভাগ্য সেই বালিকা বধূর করুণ জীবনের খোঁজ নিতে আর ফিরেও আসেনি। এই ভয়াবহ বাল্য বিবাহের অভিশাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে গত ১৭ বছরে উপরোক্ত করুণ কাহিনীর পুনরাবৃত্তিই শুধু দেখেছে চট্টগ্রাম ভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ‘ফাইট ফর ওমেন্স রাইটস’। তবে এই সংস্থা যখনই খবর পেয়েছে, তখনই তারা ছুটে গেছে হতভাগ্য কন্যা শিশুর জীবন বাঁচাতে। নিজেদের সীমিত সাধ্য, স্থানীয় আইন-শৃংখলা বাহিনীর সহায়তা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের নৈতিক সমথর্নই ছিলো তাদের ভরসা। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলার রেহানা বেগম রানু তার এবং তার সংস্থার সহকর্মীদের গত ১৭ বছর ধরে বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে কঠিন যুদ্ধের ইতিবৃত্ত জানাতে গিয়ে উপরের কথাগুলো বললেন অত্যন্ত আবেগতাড়িত কণ্ঠে। তিনি জানান, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া শুধু মোল্লা ডেকেও বিয়ে দেয়া হয়েছে অনেক কন্যা শিশুকে। এদের অনেকে আবার স্বামী পরিত্যক্ত হওয়ার পর দেনমোহরের টাকাতো দূরে থাক, সামান্য ক্ষতিপূরণের টাকাও পায়নি। এদের উদ্ধার করে ক্ষতি পূরণের অর্থ আদায়ের জন্য আইনগত সহায়তা প্রদানেরও কাজ করছে ফাইট ফর ওমেন্স রাইটস। অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু আরো জানান, সংস্থাটি ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি এবং তার সহকর্মীরা চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কন্যা শিশুকে অভিশপ্ত বাল্য বিবাহের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেক কন্যা শিশুকে উদ্ধার করে দীর্ঘদিন তার নিজের ঘরেই রাখতে হয়েছে নিরাপত্তার কারণে। চট্টগ্রামে সরকারি কোনো ওমেন্স শেল্টার নেই। পরে এইসব অসহায় কন্যা শিশু এবং স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের তিনি তার সংস্থার মাধ্যমে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে হস্তান্তর করেছেন বলে জানান। তিনি বলেন, প্রথমে এই কাজটি শুরু করার পর বহু স্বার্থন্বেষী লোক তার কাছে এসে অভিযোগ করে বলেছে, ‘আপনি কি শুরু করেছেন। আপনি মানুষের বিয়ে ভাঙছেন কেনো?’ সাম্প্রতিক সময়গুলোতে মহানগরীর রাজাপুকুর লেইন এলাকায় হৈমন্তী নামের এক শিশু কন্যাকে তিনি বাল্য বিবাহের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে প্রভাবশালীদের কোপানলে পড়েন; কিন্তু ধৈর্য ও অনড় অবস্থানের মধ্য দিয়ে অবশেষে হৈমন্তীকে বাঁচাতে সক্ষম হন। কারণ এই প্রচেষ্টার সময় তাকে স্থানীয় জনসাধারণ সহযোগিতা করেছিল। তিনি জানান, গৃহকর্তার অমানুষিক নির্যাতনের শিকার চট্টগ্রামের গৃহপরিচারিকা জাহেরা বেগমকে তিনি উদ্ধার করতে সক্ষম হন। তার মামলাটিও এই সংস্থা বিনা খরচে পরিচালনা করেছে। প্রতিবন্ধী মেয়েদের জন্য তার সংস্থা সব সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রেখেছে। তার কাছেই জানা গেলো- তার ও তার সংস্থার দ্রুত হস্তক্ষেপে সাম্প্রতিককালে বাল্য বিবাহের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া কয়েকজন কন্যা শিশুর নাম। তারা হলো, সানজিদা হোসেন চৌধুরী, সেলিনা আক্তার, নাসরিন আক্তার, মোসাম্মাত্ মনি, শারমিন আক্তার, হাজেরা আক্তার, ফাতেমা আক্তার এবং তাসলিমা আক্তার। সংস্থাটি দেশি-বিদেশি অনুদান সহায়তা ছাড়াই কাজ করে চলেছে। সহায়তা করছে প্রশাসন, গণ-মাধ্যম এবং চট্টগ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।