ক্যারিয়ারের মধ্যগগন বলে একটা কথা আছে। মুশফিকুর রহিম সেই মধ্যগগনে আছেন কি-না, সেটা বোঝা যাবে তার ক্যারিয়ার শেষে। তবে এটা ঠিক যে সোনালী একটা সময় পার করছেন তিনি। এই বছরটায় যেখানে হাত দিচ্ছেন, ব্যাট করছেন; সোনা ফলছে। এমন ইনফর্ম মুশফিকুর রহিম কতোটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা গতকাল টের পেল এবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের বিস্ময়-দল প্রাইম দোলেশ্বর।
গতকাল সুপার লিগের ম্যাচে বিকেএসপির দুই নম্বর মাঠে ৩০৪ রানের বিশাল স্কোর করেও দোলেশ্বরকে হেরে যেতে হল মুশফিকুর রহিমের ১৪৫ রানের অতিমানবীয় ইনিংস এবং স্টিভেন ক্রুকের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের কারণে। শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্রীড়াচক্রের বিপক্ষে ৬ উইকেটের এই হারে পয়েন্ট তালিকার দ্বিতীয় স্থানে নেমে এসেছে তারা। কালকের জয়ের ফলে দোলেশ্বর ও মোহামেডানের সঙ্গী হিসেবে দুই নম্বরে নাম লেখালো শেখ জামালও।
এদিকে মিরপুরে নিজেদের জয়রথ ছোটাতে থাকা গাজী ট্যাংক পয়েন্ট তালিকায় এককভাবে শীর্ষে চলে গেছে। মাহমুদউল্লাহ ও রায়ান টেন ডেসকাটের জোড়া ফিফটিতে তারা ৬ উইকেটে হারিয়েছে রবি বোপারার প্রাইম ব্যাংককে।
একদিকে বিকেএসপিতে যখন রান উত্সব হয়েছে; তখনই ফতুল্লায় মোহামেডান-কলাবাগান অ্যাকাডেমি ম্যাচে ছিল রানের জন্য হাহাকার। মাত্র ২২৬ রান করেও এই ম্যাচে ৭৬ রানের জয় পেয়েছে মাশরাফির মোহামেডান।
তিন সেঞ্চুরির ম্যাচ
এবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের প্রথম থেকেই চমকের মতো ছুটছিল প্রাইম দোলেশ্বরের জয়যাত্রা। শীর্ষ দল হিসেবে সুপার লিগে এসেও সেই যাত্রা তারা প্রথম ম্যাচে ধরে রেখেছিল। গতকালও শেখ জামালের বিপক্ষে জয় একদম হাতের কাছেই চলে এসেছিল দোলেশ্বরের। কিন্তু সেই জয় থেকেই তাদের বঞ্চিত করলেন ক্রুক ও মুশফিক।
প্রথমে ব্যাট করে জশুয়া কবের সেঞ্চুরি ও দাওয়িদ মালানের ফিফটিতে ৩০৪ রানের বিশাল পুঁজি সংগ্রহ করে দোলেশ্বর। ওপেনার কব ইনিংসের ৪২তম ওভারে মুনাবীরার বলে আউট হওয়ার আগে ১৩০ বলে ১০টি চার ও ৫টি ছক্কায় সাজানো ১২৩ রানের ইনিংস খেলে যান।
এই বিশাল রান পাড়ি দিতে গিয়ে শেখ জামাল বড় ব্যবধানে হারবে বলেই মনে হচ্ছিল। ৩২ রান তুলতে দুই ওপেনারকে হারিয়ে ফেলে তারা এবং দলীয় ৯০ রানে আহত হয়ে ফিরে আসেন মুনাবীরাও! কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় মুশফিক ও ক্রুকের পাল্টা আক্রমণ।
১৫৮ বলে ১৮৯ রানের ভয়ানক এক জুটি করে এই দু’জন শুধু প্রতিরোধই গড়েননি, প্রতিআক্রমণ করেও দোলেশ্বরকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন। ৮৪ বলে ৭টি চার ও ৬টি ছক্কায় সাজানো ঠিক ১০০ রানের ইনিংস খেলে ক্রুক ফিরে আসেন। তবে মুশফিক হার মানেননি। শেষ পর্যন্ত খেলার ৪ ওভার বাকি থাকতেই দলকে জয় এনে দিয়ে তবেই মাঠ ছাড়েন মুশফিক। আর এই হাসি নিয়ে মাঠ ছাড়ার সময় নামের পাশে তার ১১৮ বলে ১২টি চার ও ৫টি ছক্কায় সাজানো ১৪৫ রানের এক ইনিংস!
গাজীর জয়যাত্রা
প্রাইম ব্যাংকের অধিনায়কত্ব ঘুরতে ঘুরতে এখন ইংলিশ অলরাউন্ডার রবি বোপারার হাতে এসেছে। কাল সেই পদের সম্মান রাখার মতোই ব্যাটিং করলেন বোপারা; ৫ রানের জন্য সেঞ্চুরি পেলেন না। কিন্তু বোপারার এই দারুণ লড়াই বিফলে গেল মাহমুদউল্লাহ ও ডেসকাটের দুই দুরন্ত ফিফটিতে।
প্রথমে ব্যাট করা প্রাইম ব্যাংক ১৬ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ফেললেও ওপেনার সৈকত আলী ও চার নম্বরে নামা সিহান জয়াসুরিয়া চতুর্থ উইকেটে ৮১ রান যোগ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সিহান ৩২ রান করে আউট হয়ে গেলেও সৈকত আউট হওয়ার আগে করেন ৬০ রান। আর এই দু’জনের গড়ে দিয়ে যাওয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে টেল এন্ডারদের নিয়ে ২৪৭ রানের মাঝারি সংগ্রহ দাঁড় করান বোপারা; তিনি আউট হন ৯৫ রান করে।
জবাব দিতে নেমে ওপেনার আফতাব আহমেদের ৪৫ রানের ইনিংসের পরও ১২১ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলে গাজী ট্যাংক। আর এখান থেকেই যাত্রা শুরু মাহমুদউল্লাহ ও ডেসকাটের অপরাজিত জুটির। এই জুটিতে অপরাজিত ১২৭ রান যোগ করে দলকে জয় এনে দেন তারা। ডেসকাট টানা দ্বিতীয় ফিফটি, ৬৮ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন। মাহমুদউল্লাহ অপরাজিত থাকেন ৬৭ রান করে।
সমিত প্যাটেলের ম্যাচ
কাগজে-কলমে অন্তত মোহামেডানকে আটকানোর মতো দল নয় কলাবাগান অ্যাকাডেমি। কিন্তু নিজেদের অধারাবাহিকতা যা একটু সংশয়ে রেখেছিল মোহামেডানকে। তবে সব সংশয় উড়িয়ে দিলেন সমিত প্যাটেল একাই।
আগে ব্যাট করা মোহামেডান এমন কিছু বড় পুঁজি দাঁড় করাতে পারেনি। নিয়মিত উইকেট হারাতে থাকার মধ্যে এক প্রান্তে রুখে দাঁড়ানো প্যাটেলের ৮৬ রান এবং শেষ দিকে রহমত শাহর ৩৩ রানে ২২৬ রান সংগ্রহ করতে পারে মাশরাফির দল।
এই রান তাড়া করতে গিয়েও দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে কলাবাগান অ্যাকাডেমি। ওপেনার অভিষেক মিত্রর ৫১ রানের ইনিংসের পরও মাত্র ১৫০ রানে শেষ হয়ে যায় তাদের ইনিংস। আর ২৫ রানে ৩ উইকেট নিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞের নেতৃত্ব দেন ম্যাচসেরা প্যাটেলই।
স ং ক্ষি প্ত স্কো র
গাজী ট্যাংক-প্রাইম ব্যাংক
প্রাইম ব্যাংক: ৫০ ওভারে ২৪৭/৮ (রবি বোপারা ৯৫, সৈকত আলী ৬০; আরাফাত সানি ৩/৫৭)।
গাজী ট্যাংক: ৪৭.৫ ওভারে ২৪৮/৪ (ডেসকাট ৬৮*, মাহমুদউল্লাহ ৬৭*, আফতাব ৪৫; সিহান ২/৪৮)।
ফল: গাজী ট্যাংক ক্রিকেটার্স ৬ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মাহমুদউল্লাহ
প্রাইম দোলেশ্বর—শেখ জামাল
প্রাইম দোলেশ্বর: ৫০ ওভারে ৩০৪/৭ (কব ১২৩, মালান ৬১; মুনাবীরা ২/৪৯, ক্রুক ২/৫৭)।
শেখ জামাল: ৪৬ ওভারে ৩০৫/৪ (মুশফিক ১৪৫*, ক্রুক ১০০; সোহাগ ২/৬০)।
ফল: শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব ৬ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মুশফিকুর রহিম
মোহামেডান স্পোর্টিং-কলাবাগান অ্যাকাডেমি
মোহামেডান: ৫০ ওভারে ২২৬/৯ (প্যাটেল ৮৬; অপু ৩/৪৬, মাকসুদুল ২/৪১, শরীফ উল্লাহ ২/৪৫)।
কলাবাগান অ্যাকাডেমি: ৪০.১ ওভারে ১৫০/৯ (অভিষেক ৫১; প্যাটেল ৩/২৫, হাবিবুর ২/২৪, রহমত ২/৪১)।
ফল: মোহামেডান ৭৬ রানে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: সমিত প্যাটেল।
