তত্ত্বময় রাজনীতি!

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৩, ২২:১৫
হালে বাংলাদেশের রাজনীতি যেন তত্ত্বময় হয়ে উঠেছে। মাওলানা শফীর ‘তেঁতুল তত্ত্ব’, বিএনপি সাংসদ শাম্মী আক্তারের ‘চুদুর বুদুর’ তত্ত্ব, দুই নেত্রীর ‘চুল’ তত্ত্ব, সাদেক হোসেন খোকার ‘দা-কুড়াল’ তত্ত্বের ধারাবাহিকতায় এবার এলো এরশাদের ‘থুতু তত্ত্ব’। থুতু তত্ত্বের (পার্ট-১) ভূমিষ্ঠকাল ১১ নভেম্বর। ওই দিন নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, ‘সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে গেলে মানুষ আমাকে থুতু দেবে না? সম্মান বড় না জেল বড়? এর চেয়ে জেলেই মরে যাওয়া ভালো।’ সপ্তাহ গড়াতেই এরশাদ থুতু বিষয়ে নতুন তত্ত্বের (পার্ট-২) জন্ম দেন; যা আগের তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত। ১৮ নভেম্বর দুপুরে রাজধানীর বনানীতে জাপার কার্যালয়ে দেওয়া এক সংবাদ সম্মেলনে এরশাদ বলেন, ‘এই সরকারকে সরাতে হলে নির্বাচন দরকার। নির্বাচনে না গেলে মানুষ থুতু দেবে। শুধু আমাকে নয়, সব রাজনীতিককেই জনগণ থুতু দেবে।’ ১১ নভেম্বরের থুতু তত্ত্বে এরশাদ ‘সর্বদলীয় সরকারকে’ অসাংবিধানিক বলেছিলেন। অথচ ১৮ নভেম্বরের থুতু তত্ত্বে ওই ‘অসাংবিধানিক সরকারে’ অংশগ্রহণের ঘোষণাই কেবল দিলেন না, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকেও তাতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এক পা এগিয়ে এসেছেন, আমিও এক পা এগিয়ে এসেছি। বিএনপিকেও অনুরোধ করছি, আপনারাও এগিয়ে আসুন।’ এমনকি ওই দিন সংবাদ সম্মেলনের মাত্র তিন ঘণ্টার মাথায় স্ত্রীসহ তাঁর দলের ৫ জন ওই ‘অসাংবিধানিক সরকারের’ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। আরেকজন গ্রহণ করলেন মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টার পদ। থুতু তত্ত্বের জনক এর আগে একাধিকবার বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট, তাঁদের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলে তা সুষ্ঠু হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ২০ অক্টোবর সাংবাদিকদের বলেন, ‘একতরফা নির্বাচনে অংশ নিয়ে ‘দালাল’ হয়ে মরতে চাই না।... কাউকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য আমরা নির্বাচন করবো না।’ সর্বশেষ গত ১৪ নভেম্বর জাতীয় ছাত্রসমাজের অনুষ্ঠানে এরশাদ বলেন, ‘আমি ঘোষণা করছি, এবার আমরা কারো ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহূত হবো না। সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে যাবো না।’ এমনকি তার আগের সপ্তাহে একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বেহেশতেও যেতে চান না বলে মন্তব্য করেন। সেই এরশাদ ১৮ নভেম্বরের থুতু তত্ত্বে শেখ হাসিনার অধীনে আগামী নির্বাচনে কেবল অংশগ্রহণের কথাই বললেন না, ক্ষমতাসীন মহাজোট ছাড়ার এবং এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দেন। সঙ্গে গাইলেন সাফাই: ‘আমি সর্বদলীয় সরকারে এসেছি, যাতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়।.... আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানি না। তাই বলে কি ইলেকশন হবে না?’ থুতু ঘৃণার প্রতীক। রোষের প্রতীক। রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগণের ভালোবাসা যেমন চিরন্তন, তেমনি ঘৃণা বা রোষও সহজাত। একজন রাজনীতিকের জীবনে ফুলের মালা যেমন জোটে— নিজ কর্মফলে তেমনি জোটে জুতার মালা, থুতু, পচা ডিম, ঝাড়ু ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো, এরশাদ তাঁর তত্ত্বে জনগণের ঘৃণা বা রোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অন্য সমস্ত মাধ্যম বাদ দিয়ে ‘থুতু’কে বেছে নিলেন কেন? পরিসংখ্যানে তো জুতাই এগিয়ে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ, আসিফ আলী জারদারী; ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ পৃথিবীর প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এই জুতার কাছে নতি স্বীকার করেছেন। এক্ষেত্রে সর্বাধিক জুতা খাওয়ার রেকর্ডটি তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট মা ইং জো-র পকেটে। চলতি ২০১৩ সালেই এই কীর্তিমান পুরুষ (!) ১০ বার বিক্ষোভকারীদের ছোড়া জুতা খাওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তাও আবার স্বদেশে বসে! তার মধ্যে গত অক্টোবরে খেয়েছেন ৫ বার । মজার ব্যাপার হলো কোনো জুতাই তাঁর ত্বক স্পর্শের সাহস দেখাতে পারেনি। অন্তত উইকিপিডিয়া তাই বলছে। সেই বহুল জনপ্রিয় জুতা ফেলে থুতু বেছে নেওয়ার কারণটাও সঙ্গত—চারিত্রিক মিল। ‘থুতু’ তরল পদার্থ— যখন যে পাত্রে থাকে, সে পাত্রের আকার ধারণ করে। এরশাদও তরল পদার্থ। খালেদার সঙ্গে থাকলে তাঁর বুলি, ‘সবার অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে গেলে মানুষ থুতু দেবে’। হাসিনার সঙ্গে থাকলে ওই বুলি হয়, ‘নির্বাচনে না গেলে মানুষ থুতু দেবে’। রাজনৈতিক পরগাছার মতো যখন যাকে আঁকড়ে ধরেন, তাঁর সুরে কথা বলেন। তাছাড়া ‘থুত’ু যেমন পিচ্ছিল— এরশাদও তেমনি মানসিকভাবে পিচ্ছিল। সকালে এক রকম, বিকালে আরেকরকম। কখনো স্থির না। থুতু যেমন ধরে রাখা যায় না। এরশাদকেও তেমন ধরে রাখা যায় না। বেঁধে রাখা যায় না। বিশ্বাস করা যায় না। সব সময় যেদিকে হাওয়া, সেদিকেই তিনি পাল ধরেন। অতএব এরশাদ তাঁর তত্ত্বে থুতুকে ব্যবহার করবেন, এটাই স্বাভাবিক। ঢাকা