মোটর সাইকেলে যাত্রী টানা

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৪৯
শিক্ষিত যুবকরা এখন আর সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরির জন্য বসে থাকছে না। তারা নতুন নতুন পেশায় যুক্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নিচ্ছে। নদীবেষ্টিত এ অঞ্চলের বেকার যুবকরা নতুন নতুন সড়কপথে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও নৌপথে স্পিডবোট চালিয়ে জীবিকা নির্বাহের নতুন পথ বেছে নিয়েছে। এ বিভাগের ভোলা, ঝালকাঠী, পটুয়াখালী, বরগুনা ও পিরোজপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের এখন প্রধান বাহন মোটরসাইকেল। এক সময় যেসব এলাকার মানুষ মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে অথবা নৌকা চড়ে শহর-বন্দরে যাতায়াত করতো তাদের এখন প্রধান বাহন মোটরসাইকেল। কালের বিবর্তনে নৌকা চলাচল বলতে গেলে বন্ধ হয়ে গেছে। মোটরসাইকেলে উঠে মানুষ ছুটছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আর এ মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করার পথ বেছে নেয় এ অঞ্চলের বিশাল একটি বেকার জনগোষ্ঠী। এখন আর এমন কোনো উপজেলা বা বড় হাট-বাজার নেই যেখানে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল পাওয়া যায় না। এককালের বেকার যুবকরা মোটরসাইকেলে যাত্রী বহন করে হর্ন বাজিয়ে এ গ্রাম থেকে অপর গ্রামে ছুটে যাচ্ছেন। এদের অধিকাংশই উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে চাকরি না পেয়ে শক্ত হাতে মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেল ধরেছেন। কারো কারো রয়েছে উচ্চতর ডিগ্রী। নৌকা চালানো বা দিনমজুরের কাজে আপত্তি থাকলেও মোটরসাইকেলে যাত্রী বহন করে অর্থ উপার্জনে আপত্তি নেই এসব শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত যুবকদের। এটা একটা স্বাধীন ব্যবসাও বটে। নগর সংলগ্ন চরমোনাই ইউনিয়নের বেলতলা খেয়াঘাট থেকে বুখাইনগর পর্যন্ত মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরত্বে দৈনিক দু’শ থেকে তিনশ’ মোটরসাইকেল চলে। মোটরসাইকেল চালকরা জানান, প্রতিদিন সকল খরচ বাদ দিয়ে চার-পাঁচশ টাকা আয় হয়। ঈদ-কোরবানী ও চরমোনাই’র মাহফিলের সময় দ্বিগুণ উপার্জন হয়। একইরকম আয় কলাপাড়া, হাজিপুর, মহিপুর, আলিপুর, তালতলী, আমতলীসহ বিভিন্ন রুটের মোটরসাইকেল চালকদের। তারা জানান, পর্যটকদের যাতায়াতের উপর তাদের আয়-উপার্জন নির্ভর করে। গ্রামগঞ্জে যারা মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা সকলেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালভাবে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানান। দক্ষিণাঞ্চলের কমপক্ষে ছয়-সাত হাজার বেকার যুবক মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। দুর্ঘটনা ছাড়া তেমন কোনো ঝুঁকি নেই এ পেশায়। দুর্ঘটনার আশংকায় কেউ কেউ দুই চাকার মোটরসাইকেলের পরিবর্তে তিন চাকার অটোরিকশা আবার কেউ কেউ ৪ চাকার মাইক্রোবাস চালিয়ে যাত্রী পরিবহন করে পরিবারের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করছেন। মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পুঁজি খুব কম লাগে। অটোরিকশা বা মাইক্রোবাস ক্রয় করে যাত্রী পরিবহন করতে তিন-চারগুণ বেশি পুঁজির প্রয়োজন। তার উপরে রয়েছে ট্রাফিক পুলিশের বাড়তি ঝামেলা। বেশি আয়ের স্বপ্ন যাদের তারাই অধিক লাভের আশায় মোটরসাইকেল বিক্রি করে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও রোগী বহনকারী এ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করে রাস্তায় নামছেন। উপার্জনের টাকা সঞ্চয় করে কেউ কেউ একাধিক গাড়ির মালিক হয়েছেন। তারা সহকর্মীদের কাছেই দৈনিক অথবা চুক্তিভিত্তিক এসব যানবাহন ভাড়া দিয়ে বাড়তি আয়-রোজগার করে বেশ স্বাবলম্বী হয়েছেন। একটি গাড়ি থেকে ২/৩টি গাড়ির মালিক হওয়ার নজির এ অঞ্চলে অনেক। তারা ট্রাফিক পুলিশ ম্যানেজ করেই ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং ছাড়া অন্য যেকোন কাজে যেকোন স্থানে যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া দিতে এদের আপত্তি নেই। একটু চেনা-জানা হলে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়ায় গভীর রাতেও যাত্রী পরিবহনে রাজী এরা। তবে মোটরসাইকেল চালকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ম্যানেজ করতে পারেন না ট্রাফিক পুলিশকে। তাদের প্রায়ই গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক এলাকার গাড়ি অন্য এলাকায় চালাতে গেলেও ঝামেলায় পড়তে হয়। স্ব-স্ব এলাকায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে স্থানীয়ভাবে গজিয়ে ওঠা মালিক কিংবা শ্রমিক ইউনিয়নের নামে কঠোর পরিশ্রমের টাকার একটি অংশ তাদের হাতে তুলে দিয়ে আসতে হয়। অন্যথায় নানা সমস্যায় পড়তে হয় মোটরসাইকেল চালকদের। নৌকার পরিবর্তে নৌপথে এসেছে আধুনিক নৌযান স্পীডবোট। এ পেশার সাথে বরিশাল অঞ্চলের কমপক্ষে পাঁচ-ছয়শ’ যুবক জড়িত হয়েছে। জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নদী-নালা, খাল-বিলে স্পিডবোট চলছে সমান গতিতে। আগে হাতেগোনা কয়েকটি স্পীডবোট বরিশাল-ভোলা ও মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা রুটে ধনাঢ্য যাত্রীদের বহন করতো। এখন বাউফল, কালাইয়া, কালিশুরী, বগা, পটুয়াখালীর দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট চলাচল করছে। ভোলা-বরিশাল সড়কপথের আড়িয়াল খাঁ নদী পারাপারের জন্য যুক্ত হয়েছে প্রায় অর্ধশত স্পীডবোট। চাকরিজীবীদের চেয়ে স্পিডবোটের চালকদের আয়-রোজগার মোটেই কম নয়। আত্মকর্মসংস্থান করে বেশ ভালোভাবেই জীবন কাটছে দক্ষিণাঞ্চলের এসব যুবকের।