পৌষের কাছাকাছি কুয়াশাঢাকা ভোরে শিউলি ফুল আলো ছড়াইতেছে, অথচ বিস্ময়করভাবে গাছে গাছে এখনও আষাঢ়ের কদম্ব ফুল ফুটিয়া আছে! বস্তুত, বৈশ্বিক জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশেও ইতোমধ্যে লক্ষণীয় হইয়া উঠিয়াছে। ঋতুচক্রে গণ্ডগোল ঘটিয়া গিয়াছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমাগত বাড়িতেছে। ইত্যবসরে, নূতন এক অনুসন্ধান নিয়া হাজির হইয়াছেন গবেষকরা। তাহাদের দাবি, লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বাড়িতেছে রোগ আর গর্ভস্থ সন্তান মৃত্যুর ঝুঁকি। বিগত ৩০ বত্সর ধরিয়া কক্সবাজারের নিকটবর্তী চকরিয়ায় বেশ কয়েকটি এলাকায় স্বাস্থ্য কার্যক্রম ও গবেষণা চালাইতেছে আইসিডিডিআর-বি। তাহাদের দাবি, সমুদ্র হইতে যাহারা দূরে থাকেন তাহাদের বাচ্চা নষ্ট হইবার আশঙ্কা কম থাকে। ২০১২ সাল হইতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাহাড় ও সমতল অঞ্চলের ১২ হাজার ৮৬৭ জন গর্ভবতী নারীকে পর্যবেক্ষণ করিয়াছে আইসিডিডিআর-বি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, যাহারা সমুদ্রপৃষ্ঠ হইতে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে কিংবা ৭ মিটার উচ্চতায় থাকেন, তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী অঞ্চল হইতে তাহাদের গর্ভস্থ সন্তান মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৩ গুণ বেশি। চকরিয়া হইতে কুমিল্লার মতলব অঞ্চল পর্যন্ত আইসিডিডিআর-বির পর্যবেক্ষণে থাকা এলাকাগুলিতেও এই পার্থক্য স্পষ্ট। গর্ভে থাকা শিশু মৃত্যুর হার চকরিয়ায় ১১ শতাংশ আর মতলবে ৮। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই পার্থক্যের মূল কারণ লবণাক্ত পানি, আর এই লবণাক্ততার কারণ জলবায়ু পরিবর্তন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, অনাবৃষ্টিসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়াবহ হইয়া উঠিতেছে। বিশ্বজুড়িয়া কোথাও হইতেছে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, আবার কোথাও গলিতেছে বরফ। শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলির অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা আরও বাড়িয়াছে। আর ইহার কুফল ভোগ করিতে হইতেছে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (সিআরআই)-এর এক গবেষণায় দেখা গিয়াছে, ১৯৯৬ হইতে ২০১৫ সাল, এই ২০ বত্সরে সবচাইতে বেশি ক্ষতির মুখে পড়িয়াছে পর্যায়ক্রমে হন্ডুরাস, মিয়ানমার ও হাইতি। চতুর্থ অবস্থানে আছে নিকারাগুয়া, পঞ্চম ফিলিপাইন ও ষষ্ঠ অবস্থানে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) তাহাদের চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছে, এই শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ডুবিয়া যাইতে পারে। দেশের ১৯টি জেলার প্রায় ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ডুবিয়া যাইবার ঝুঁকিতে আছে। ইহার পরিণতিতে গৃহহারা হইবে প্রায় দুই কোটি মানুষ। বর্তমান হারে জলবায়ু পরিবর্তন অব্যাহত থাকিলে বরিশাল অঞ্চলের ৮৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় লবণাক্ততার বিস্তৃতি ঘটিবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা) লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাইবে। ফলে মাত্র ১২ শতাংশ এলাকায় আমন চাষ করা সম্ভব হইবে।
বিশেষ কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠী নহে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের মুখে পড়িয়াছে পৃথিবী নামক গ্রহটিই। বিশেষত গত ২০ বত্সরে এই প্রভাব ছড়াইয়া পড়িয়াছে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা হইতে আমেরিকা মহাদেশেও। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিগুলি দিন দিন বাড়িতেছে। এদেশে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে লবণাক্ততা ক্রমাগত বাড়িয়া বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিষাক্ত করিয়া তুলিয়াছে, বিপন্ন করিতেছে নারী ও শিশুস্বাস্থ্যসহ সমগ্র প্রাণবৈচিত্র্য। লবণাক্ততার কারণে গর্ভস্থ শিশু মৃত্যুর খবর আমাদের উদ্বেগ বাড়াইয়া তুলিয়াছে। যদিও, এইসকল ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সচেতন শুধু নহে, প্রশংসনীয় ভূমিকাও পালন করিতেছে। তবুও দুর্যোগজনিত ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় রাখিয়া আমাদের আরও সাবধান হইতে হইবে।
