নতুন করে স্কুলের নাম রাখা হল। এবার স্কুলটির নাম হল খুশল স্কুল। সপ্তদশ শতাব্দীতে পশতুন বীর ও কবি খুশল খান খট্টক মোগলদের বিরুদ্ধে পশতুনদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ছিলেন আব্বুর সবচেয়ে প্রিয় বীর। স্কুলের প্রবেশপথে লেখা হল : নবযুগের আহ্বান শোনাতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ’। আব্বুর পরিকল্পনা মত সেখানে একটি শিল্ড বানিয়ে তাতে পশতুন ভাষায় লেখা হল খুশলের একটি বিখ্যাত উক্তি :‘আমি আফগানদের সম্মানে তরবারি হাতে নিলাম।’ আব্বু পশতুন বীরদের দিয়ে নবীন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছিলেন। তবে সেটা একালের মত করে। তরবারির পরিবর্তে সবার হাতে কলম তুলে দিয়ে। খুশল আপন জাতির মর্যাদা রাখতে শত্রুর বিরুদ্ধে তরবারি ধরেছিলেন। একালে আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় শত্রু অশিক্ষা। এই অশিক্ষার বিরুদ্ধে লড়াই করাই সবচেয়ে প্রয়োজন বলে মনে করেছিলেন আব্বু।
অনেকেই স্কুলে আসবে বলে কথা দিলেও স্কুল খুললে দেখা গেল মাত্র জনা তিনেক ছাত্র এসেছে। হোক তিন জন, তাতে কি! আব্বু রীতিমত জাতীয় সঙ্গীত গাইয়ে এবং পাকিস্তানের পতাকা তুলে ক্লাস শুরু করলেন। স্কুলে ছাত্রসংখ্যা যেমন কম তেমনি ছাত্ররা গরিবও বটে। স্কুলের খরচ যোগানোর মত পয়সা তাদের তেমন নেই। আব্বু তখন তার কলেজের অন্য শিক্ষকদের কাছ থেকে ধার নিতে নিতে দেনায় জর্জর। তাঁরা তাঁদের টাকা ফেরত চেয়ে প্রায়ই আব্বুর কাছে চিঠি লিখতেন। এতে খুব অখুশি হলেন হেদায়েতুল্লাহ।
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেখা দিল স্কুল নিবন্ধন করানোর সময়। শিক্ষা অফিসে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর আব্বু অফিসে ঢোকার সুযোগ পেলেন। ভেতরে ঢুকে তিনি দেখলেন, ফাইলপত্রের বিশাল স্তূপের পেছনে একটা চেয়ারে বসে আছেন শিক্ষা কর্মকর্তা। তাঁর টেবিলের চারপাশে বসে চা খাচ্ছেন অনেকে। আব্বুর ফাইলটা দেখে শিক্ষা কর্মকর্তা বললেন, ‘এটা কি ধরনের স্কুল? ক’জন শিক্ষক? মাত্র তিনজন তাও কারো প্রশিক্ষণ নেই! লোকে মনে করে, ইচ্ছে করলেই স্কুল খোলা যায়।’ শিক্ষা কর্মকর্তার কথা শুনে তার টেবিলের পাশে বসা লোকজন হাসতে লাগল হো হো করে। আব্বু খুব চটে গেলেন। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, ঘুষ চাচ্ছেন শিক্ষা কর্মকর্তা। পশতুনদের কেউ উপহাস করলে তারা বিষয়টাকে মোটেও সহজভাবে নেয় না। এবং যেটা ন্যায্য পাওনা, তাতে তারা ঘুষ দিতেও রাজি হয় না। তাছাড়া আব্বু আর হেদায়েতুল্লার নিজেদের খাবার যোগাড় করারই পয়সা নেই, ঘুষ দেবেন কি করে। তখন স্কুল নিবন্ধন করতে ঘুষের একটা রেট করা হয়েছিল। স্কুল পরিদর্শকের পকেটে কড়কড়ে ১৩০০ টাকা দিতে হত এবং মুরগির মাংস ও নদীর ট্রাউট মাছ দিয়ে ভোজের ব্যবস্থা করতে হত। স্কুল পরিদর্শক স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে জবর একটা ভোজ খেতেন এবং কমপক্ষে ১৩০০টি টাকা পকেটে গুঁজে তবে স্কুল নিবন্ধনের কথা বলতেন। আব্বুর স্কুলের ক্ষেত্রে যেহেতু এসব সম্ভব নয় তাই তিনি বাজি ধরলেন। বললেন, ‘আমাদের স্কুল মুরগির খামার নয়।’ তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমার কাছে এসব প্রশ্ন করছেন কেন? আমি থানায় এসেছি না আদালতে এসেছি! আমি কি ক্রিমিনাল?’ আব্বু ভয়ানক রেগে গেলেন। তিনি ভাবলেন, এভাবে চলতে দেয়া যায় না। এর একটা বিহিত করা দরকার। তবে সেটা একা একা সম্ভব নয়। পেছনে শক্তি দরকার। তাই তিনি সোয়াত অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট স্কুল নামে এক সংগঠনে যোগ দিলেন। মাত্র পনেরো জন সদস্য। আব্বু খুব তাড়াতাড়িই এই সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন।
