বাড়ির বাইরে নতুন জীবন

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৩, ২০:০৭
আমাদের দেশের প্রধান প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হাতে গোনা কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাদে বাকিগুলো ঢাকাতেই অবস্থিত। এজন্য ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাসে কিংবা মেস ভাড়া করে থাকতে হয়। কিন্তু এই জীবন বেশ কঠিন। কারণ হল মেস জীবনে থাকার কষ্ট, খাওয়ার কষ্ট থেকে শুরু করে আছে হাজারো ধরনের বিড়ম্বনা। শর্মি গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত সে যশোরে লেখাপড়া করেছে। সেখানেই পরিবারের সাথে থাকা খাওয়া কিংবা আনুষঙ্গিক কোনো বিষয় নিয়ে তাকে ভাবতে হয়নি। সে ছিল শুধু পড়াশোনার জগতে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয়েছে শর্মির নতুন জীবন। এই জীবনের নাম ‘হল এবং ক্যাম্পাস জীবন’। নতুন এই জীবনে সব কিছু তার নিজেকেই সামলাতে হয়। বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের সন্তানটি আজ দুবেলা নিজের খাবার নিজ হাতে রান্না করে খায়। নিজের কাপড় নিজেকে পরিষ্কার করতে হয়। এছাড়াও বাকি সব কাজই নিজেকে সামলাতে হয়। আর সবার আগে ক্লাস এবং পড়ালেখার চাপ তো আছেই। তারপর এই অনভ্যস্ত জীবনের সাথে গড়ে উঠেছে সখ্যতা। এই সময়টা কেমন কাটছে? জানতে চাইলে শর্মি বলেন, ‘এক সময় আমার কোনো কাজই নিজেকে করতে হতো না। এখন নিজেই করি। অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। প্রথমে কিছুদিন একটু কষ্ট লাগতো। তারপর বাবা-মা এবং পরিবারকে ছেড়ে আসার কষ্ট তো ছিলই। কিন্ত এই অবস্থান সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন হল ছেড়ে বেশি দিন বাড়িতে গিয়ে থাকলেও মনের মধ্যে হলের এবং ক্যাম্পাসের জন্য টান অনুভব করি।’ নারীদের নিরাপত্তাও আমাদের দেশের বড়ো একটি সমস্যা। এই দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করলে শর্মি বলেন, ‘আসলে এসব নিয়ে কখনো ভাবতে হয়নি। আমাদের হল কিংবা ক্যাম্পাসে কখনো এরকম ঘটনা আমার চোখে পড়েনি যে নারী হওয়ার কারণে হেনস্তা হতে হচ্ছে। আর এখন নিজের নিরাপত্তা আমি নিজেই দিতে পারি। কোনো বিপদে পড়লে খবর পাওয়া মাত্র বন্ধু-বান্ধব যারা আছে সবাই ছুটে আসে।’ উদাহরণ হিসেবে টেনে আনলেন একটি বাস্তব ঘটনা। শর্মির মুখেই শোনা যাক, ‘সেবার আমি বড়ো রকমের অসুখে পড়লাম। রুমের বন্ধুরা আমাকে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে। আমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত আমার যাবতীয় দেখভাল তারাই করেছে। একথা শুনে আমার পরিবারের মানুষজন বেশ অবাক হয়েছিলেন।’ ফিরোজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে এখন থেকে দুই বছর আগে। ঢাবির হলে ছাত্রদের আবাসন সঙ্কট আগে থেকেই ছিল। এটা ফিরোজেরও অজানা ছিল না। কিন্তু হলে থাকতে শুরু করার পর এমন পরিবেশে তাকে থাকতে হয় যা সে কল্পনাও করতে পারেনি, ‘আমি জানতাম হলে কষ্ট করে থাকতে হয়। কিন্তু একই রুমে যে ২৫-৩০ জন থাকতে হবে তা কল্পনাও করতে পারিনি। আমাদের মধ্যে অনেকে রাতে হলের বারান্দা কিংবা রিডিং রুমের টেবিলের উপর ঘুমিয়ে রাত পার করে দিচ্ছে। আমি নিজেও এটা করেছি। এছাড়া হলের ক্যান্টিনের খাবারের মানও খুব খারপ। তবে সব কিছুর পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং এখানকার বন্ধু, বড়োভাই, ছোটভাই সবাই খুবই আন্তরিক।’ ফিরোজের কাছেও এতো কষ্টের মাঝেও বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়টাই তার কাছে সব থেকে আকর্ষণীয়। এই সময়টা তার জীবনের সব থেকে আনন্দপূর্ণ বলেই সে মনে করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রথম দিকে আমার মন খুব খারাপ থাকতো। তবে হলে উঠার সপ্তাহ পার না হতেই আমি বেশ কিছু বন্ধু পেয়ে যাই। পরে আরো বাড়তে থাকে। এই বন্ধুরাই আমার জীবনের সেরা সম্পদ। আপদে বিপদে ওদেরকে সব সময়ই আমি পাশে পাই।’ এতো কষ্ট করে এই ঢাকা শহরে থাকার পেছনে সবার একই লক্ষ্য— পড়াশুনা করা, মানুষের মতো মানুষ হয়ে নিজের এবং বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করা। তারপরও আমাদের দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অকালে ঝরে পড়ছে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী। এর পেছনের কারণটা আমাদের খুঁজে দেখা দরকার।