প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে যোগ দেয়ার জন্য বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার প্রতি আবারো আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নৈরাজ্য পরিহার করে নির্বাচনে আসুন। আর নির্বাচন নিয়ে যদি কোন সন্দেহ থাকে তাহলে সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রী করতে দলের এমপিদের নাম দিন। কোন কোন মন্ত্রণালয় চান তা বলুন, দেয়া হবে। তিনি বলেন, স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
গতকাল রবিবার বিকালে গণভবনে আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে বৈঠককালে সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনে দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কাকে প্রার্থী করলাম, সেদিকে না তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নৌকাকে বিজয়ী করতে কাজ করুন। দেশ, জনগণ, গণতন্ত্র ও সংবিধানের স্বার্থে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যাতে কেউ নস্যাত্ করতে না পারে সেজন্য সকলকে ভেদাভেদ ভুলে নৌকা’র বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিএনপি-জামায়াতসহ স্বাধীনতা বিরোধীরা এক হয়েছে। এরা ক্ষমতায় আসলে দেশের সব অর্জন আবার ধ্বংস করে দেবে। মানুষের সুখ, শান্তি ও উন্নয়ন আবারো তারা কেড়ে নেবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে উঠুক, তা তারা চায় না। সরকারের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকুক সেটাও চায় না। শান্তি, উন্নয়ন, কল্যাণ, ভাগ্যোন্নয়ন এবং জঙ্গি-সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশের জন্য দেশের জনগণ আবারো নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বিশাল পরিবার। প্রতিটি আসনেই একাধিক যোগ্য প্রার্থী রয়েছে। কিন্তু সবাইকে তো মনোনয়ন দিতে পারবো না, একজনকেই দিতে হবে। ক্ষমতার ৫ বছরে ছয় মাস এবং এক বছর অন্তর অন্তর প্রতিটি আসনেই আমি ব্যাপকভিত্তিক জরিপ চালিয়েছি। এলাকায় কার কী অবস্থান তা আমার কাছে তথ্য রয়েছে। আর তৃণমূল নেতাদেরও মতামত নিয়েছি। তিনি বলেন, জরিপ ও তৃণমূলের মতামতকে সমন্বয় করেই আগামী নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হবে। তবে মনে রাখবেন, নিজেরা প্রার্থী হতে গিয়ে যদি দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের সমালোচনা করেন, তবে ভোটারদের কাছে নিজের অবস্থানকেই নড়বড়ে করে ফেলবেন। কারণ বর্তমান মন্ত্রী-এমপিরা যদি ব্যর্থ হয়, তবে এতো উন্নয়ন হলো কীভাবে? মন্ত্রী-এমপিরা উন্নয়ন করেছে বলেই দেশের জনগণের আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস বেড়েছে। যত বড় নেতাই হোন না কেন জনগণের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করা ছাড়াই কিছুই করতে পারবেন না।
প্রধানমন্ত্রী সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেশের জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেন, জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনই একজন রাজনীতিবিদের প্রধান ধর্ম। তাই জনগণের আস্থা-বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে।
আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সাংবিধানিক পন্থায় সেভাবেই নির্বাচনের ধারা আমরা শুরু করে যেতে চাই। নতুন ও আগামী প্রজন্মের জন্য সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারায় নির্বাচনের একটি স্থায়ী ধারা আমরা চালু করে যাব।
সমঝোতার পথ ছেড়ে হরতালের নামে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরাজিত শক্তির পদলেহন করাই উনার (খালেদা জিয়া) চরিত্র। তাই যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় উনি হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন, হরতালের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারছেন। কিন্তু যতই ষড়যন্ত্র হোক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং রায় কার্যকর হবেই।
প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের বিভিন্ন খাতের উন্নয়নের বিবরণ তুলে ধরে বলেন, দেশের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে বর্তমান সরকার উন্নয়ন করেনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা মানেই দেশের উন্নয়ন। যারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ করে, তারা ক্ষমতায় থাকলেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। আর পরাজিত শক্তির দোসররা ক্ষমতায় থাকলে দেশের উন্নয়ন হয় না, তারা শুধু নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন করে।
নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরও নির্বাচন নিয়ে যাতে কারোর সন্দেহ না থাকে সেজন্য সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। স্বত:স্ফূর্তভাবে মন্ত্রিসভার সদস্যরা আমার কাছে পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে আবেদন জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে আবেদন করলেই পদত্যাগ হয়ে যায় না। প্রধানমন্ত্রী যেসব মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন, তাদেরটাই গৃহীত হবে। অনেক মন্ত্রীকে বাদ দেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে শেখ হাসিনা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার বড় হয় না, ছোট আকারে করতে হয়। সর্বদলীয় সরকারে আসা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যদেরও মন্ত্রী করতে হয়েছে। এ কারণে কিছু মন্ত্রীকে নেয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু ব্যর্থতার কারণে কাউকেই বাদ দেয়া হয়নি, বরং বাদ পড়া সকল মন্ত্রীই ৫ বছর সফলতার সঙ্গে মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন, দেশের ব্যাপক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।
বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি-জামায়াত জোট জনগণের শান্তি কেড়ে নিয়েছিল। দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল দেশকে। হাওয়া ভবনের পাওয়া না মিটিয়ে কেউ কোনো ব্যবস্থা পর্যন্ত করতে পারেনি। মাথা থেকে নিচ পর্যায় পর্যন্ত কমিশন দেয়ার কারণে কোনো উন্নয়ন হয়নি। আবারও নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে দেশসেবার সুযোগ দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীতে ক্ষমতায় আসতে পারলে প্রতিটি জনগণের ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছে দেব, প্রতি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করবো। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো ইনশাল্লাহ।
বৈঠকে সারাদেশের ৩শ’ আসনের বিপরীতে দলীয় মনোনয়নের আবেদনপত্র সংগ্রহকারী আড়াই সহস্রাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের শুরুতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চারনেতাসহ স্বাধীনতা এবং পরবর্তী সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করা হয়।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে সব ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন অতীতের নির্বাচনের মতো নয়। ক্ষমতার পালাবদলেরও নির্বাচন নয়। এবারের নির্বাচন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ বিনির্মাণের নির্বাচন।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সংসদীয় বোর্ডের সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, বেগম মতিয়া চৌধুরী, ওবায়দুল কাদের, অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবুল মাল আবদুল মুহিত, এইচ টি ইমাম, ড. মশিউর রহমান, ড. গওহর রিজভী, সাহারা খাতুন প্রমুখ।
