অন্য প্রিন্সিপালরা অনুদান পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে লাগলেন। আব্বু যুক্তি দেখালেন, সবাই যদি এক জোট হওয়া যায় তবে এই ঘুষ নেয়া আমরা ঠেকাতে পারব। তিনি তাদের বোঝালেন, ‘স্কুল চালানো কোন অপরাধ হতে পারে না। আমরা কেন ঘুষ দিতে যাব? আমরা কোন খারাপ কাজ করছি না, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্ছি! সরকারি কর্মকর্তারা আমাদের বস নয়। তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তারা বেতন নিচ্ছে তাই তারা আমাদের কাজ করে দিতে বাধ্য। বরং আমরাই তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখাচ্ছি।’ কিছু দিনের মধ্যেই সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট হলেন আব্বু। সংগঠনটির আকারও বাড়তে লাগল হু হু করে। চারশ’ প্রিন্সিপাল যোগ দিলেন এতে। হঠাত্ করেই স্কুল মালিকদের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা এসে গেল। তবে আব্বু ব্যবসায়ী প্রকৃতির মানুষ নন। খানিকটা রোমান্টিক ধরনের। এদিকে স্কুল চালাতে গিয়ে আব্বু এবং হেদায়েতুল্লাহর অবস্থা কাহিল। টাকা-পয়সা পকেটে নেই তো নেই-ই। রেস্তোরাঁয় গিয়ে চা খাওয়ার মত পয়সাও থাকে না অনেক সময়। শেষে আয় বাড়াতে তারা একটা খাবারের দোকান খুললেন স্কুল প্রাঙ্গণে। সকালবেলা বাজারের বেকারি থেকে কিছু স্নাকস কিনে সেগুলো স্কুলের সময় বিক্রি করতেন ছাত্রদের কাছে। আব্বু বাজার থেকে ভুট্টা কিনে আনতেন এবং গভীর রাত জেগে পপকর্ন বানাতেন।
হেদায়েতুল্লাহ সেসব দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিযে বলেন, ‘এত সমস্যা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল যে মাঝে মাঝে আমি হতাশায় ভেঙ্গে পড়তাম। কিন্তু জিয়াউদ্দিন ছিল ঠিক আমার উল্টো। সমস্যা যতই বাড়ত তার কাজ করার আগ্রহ আর সাহস।’ একথা সত্যি আব্বু সবসময় বড় কিছু কল্পনা করতে ভালোবসেন। হেদায়েতুল্লাহ বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র-পাত্র জোগাড়ের চেষ্টা করে ফিরে এসে দেখেন আব্বু স্কুলের অফিস ঘরে বসে পাকিস্তান টেলিভিশন চ্যানেলের স্থানীয় প্রতিনিধির সঙ্গে বসে টিভিতে স্কুলের বিজ্ঞাপন দেয়ার বিষয়ে কথা বলছেন। লোকটা চলে যেতে হাসিতে ফেঁটে পড়লেন হেদায়েতুল্লাহ। তিনি বললেন, ‘জিয়াউদ্দিন, আমাদের একটা টিভি পর্যন্ত নেই। বিজ্ঞাপন প্রচার হলে, আমরাই তো দেখতে পাব না!’ আব্বু স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। স্বপ্নের জগতে ভাসতে ভাসতে অনেক সময় বাস্তবতাটাও মনে থাকে না তার।
একদিন আব্বু বললেন, ‘হেদায়েতুল্লাহ, আমি একটু গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি, ফিরতে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।’ আসলে আব্বু তখন বিয়ে করবেন কিন্তু বিয়ের কথাটা মিঙ্গোরার বন্ধুবান্ধবের কাছে গোপন রাখলেন। কারণ টাকা-পয়সার অভাব। তাদের ভালোমত যত্নআত্তি করতে পারবেন না বলেই কথাটা তিনি জানাতে চাননি তাদের। আমাদের সমাজে বিয়ে একটা বিরাট ব্যাপার। টানা কয়েকদিন ধরে চলে খানাপিনা। তাছাড়া আরো একটা ব্যাপার ছিল, আব্বুকে আমার আম্মু বলে দিয়েছিলেন, বিয়ের অনুষ্ঠান কয়েকটা দিন ধরে চলবে। তাতে আমার আব্বুর যাওয়ার দরকার নেই, শুধু শেষ দিন, যেদিন পরিবারের সবাই একখানি পবিত্র কোরআন আর একটা শাল মাথায় নিয়ে নতুন বর-বউয়ের সামনে একটা আয়না ধরে, সেদিন গেলেই চলবে। পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়ে হয় যাদের তেমন বর-কনের অধিকাংশই এদিনই পরস্পরের মুখ দেখার সুযোগ পায়। এদিন একটা ছোট ছেলে বর-কনের কোলে বসিয়ে কামনা করা হয়, তাদেরও যেন এরকম একটা পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।
