‘ধর্ম যার যার, উত্সব সবার’

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৫৪

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের একটি জনপ্রিয় শ্লোগান হলো—‘ধর্ম যার যার, উত্সব সবার’। এই শ্লোগানটি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী মূল্যবোধেরই সাক্ষ্য বহন করে। এটি আন্তর্জাতিক মহলেও একটি নজির সৃষ্টি করেছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এই দৃষ্টান্ত বর্তমান শাসকদের জন্য সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।

উপরিউক্ত কারণে দুর্গাপূজার মতো সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের উত্সবকালে সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে যথোপযুক্ত ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। গত বছর ২০১৭ সালে সারা বাংলাদেশে ৩০ হাজারেরও বেশি মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং কোনো নিরাপত্তাগত সমস্যা ছাড়া নির্বিঘ্নেই তা সম্পন্ন হয়। এ বছর ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৩১,২৭২টি মন্দিরে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে দুর্গাপূজা। এই সময় সংখ্যালঘু হিন্দু সমপ্রদায়ের এলাকায় শুধু নয়, সারাদেশেই নেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা।

রক্ষণশীলতার হিসেবে বাংলাদেশে বর্তমানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মোট জনসংখ্যা ১২ শতাংশ। তন্মধ্যে হিন্দু জনগোষ্ঠী ১০ শতাংশ, বৌদ্ধ ১ শতাংশ, খ্রিস্টান ০.৫ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১ শতাংশের কম। যদিও ঐতিহ্যগতভাবে এই দেশে উদারমান বাঙালি সংস্কৃতি ক্রিয়াশীল এবং ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ফলে জন্মলাভ করে বাংলাদেশ, তথাপি এসব সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ভাগ্য সময়ান্তরে উঠানামা করে। রাজনৈতিকভাবে শাসন ক্ষমতায় কখন কারা আছেন, এই উঠানামা নির্ভর করে তার ওপর। সাধারণভাবে বিবেচনা করা হয়, এ দেশে ধমীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত এবং তারা এই দলটির নিশ্চিত ভোটব্যাঙ্ক। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো। তাছাড়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি পুনরুদ্ধার ও সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের জীবন মানোন্নয়নে বেশ কিছু তাত্পর্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা যুদ্ধে পালন করে অগ্রণী ভূমিকা। এরপর ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে সংবিধান প্রণয়নের সময় তারা গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকেও দেশের সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে।

এরপর আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতারোহণ করেছে, তখনই এইসব নীতি-আদর্শ রক্ষার চেষ্টা করেছে। চেষ্টা করেছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও কল্যাণ সংরক্ষণ করতে। ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন সম্পাদিত হয় ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। ফলে সেই এলাকায় শান্তি পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়। চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবরূপ দিতে সরকারের নীতি ও প্রচেষ্টা সক্রিয় থাকলেও এখনও অনেক কিছুই রয়ে গেছে অবাস্তবায়িত। এটার কারণ এখানকার উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতি। এখানে বেশকিছু দেশীয় বিদ্রোহীগোষ্ঠী সক্রিয়। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে মিয়ানমার ও সেখানকার সেনাবাহিনীর প্রশ্রয় পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারপরও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছার কোনো কমতি নেই। সরকার এই ব্যাপারে নিয়েছে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যেমন—সম্প্রতি এজন্য গঠন করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন।

যাহোক, বিএনপি ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মতো সামরিক শাসকরা যখন ক্ষমতায় এলেন এবং সরকার গঠন করলেন, তখন আওয়ামী লীগের এসব প্রচেষ্টা মাঝখানে থেমে থেমে উল্টে যেতে থাকে। এই সরকারগুলি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে খেলতে শুরু করে ইসলামি কার্ড। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে দিলেন। সেখানে প্রাধান্য দিলেন ইসলামি আদর্শকে। একইভাবে জেনারেল এরশাদ যখন ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করলেন, তখন তিনি সংবিধানে ইসলামকে ঘোষণা করলেন রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে এবং ইসলামকে তার শাসনপ্রণালীর প্রধান নীতি হিসেবে গ্রহণ করলেন। ফলে এই সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি নৃশংসতা বৃদ্ধি পেতে লাগল।

এটা সকলের জানা কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় মনোবল ও পদক্ষেপ ছাড়া যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর করা সম্ভব ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় এসব নেতা স্বাধীনতাকামী মানুষ ও হিন্দুদের ওপর অকথ্য ও বর্বর অত্যাচার-নির্যাতন চালায়।

সম্ভবত বাংলাদেশজুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে যে দৃশ্যমান অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে তা হলো—সরকারি চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এখন সরকারি চাকরিতে নিয়োগে তাদের হার ৫ থেকে ৭ শতাংশ। পুলিশ বাহিনীতে এই হার ১০ শতাংশ। এমনকি বিচারপতি এস কে সিনহা ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি।

রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত ঢাকেশ্বরী মন্দির আজ ঐতিহ্যগতভাবেই হিন্দু সমপ্রদায়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন সময় এই মন্দিরে তাদের সহযোগিতার হাত সমপ্রসারিত করেছে। অতি সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় সরকার এই মন্দিরের সন্নিকটবর্তী ২৭ কাঠা জমি মন্দির কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তরের জন্য একটি চুক্তি সম্পাদন করতে মধ্যস্থতা করেছে। এই ২৭ কাঠা জমির বর্তমান বাজারমূল্য ৫০ কোটি টাকারও বেশি। এটা মন্দির কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০ কোটি টাকায়। তাছাড়া আওয়ামী সরকার হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টে রক্ষিত ২১ কোটি টাকাকে ১০০ কোটি টাকায় উন্নীত করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

যদিও পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জমিজমা দখল ও তাদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত আছে, তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যে গুণগত পরিবর্তন দেখা দিয়েছে তা হলো—এই ধরনের ঘটনা ঘটামাত্র তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এই ব্যাপারে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা যেমন—জেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন দ্রুত সাড়া প্রদান করছে, যা উত্সাহজনক।

সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ে জড়িত সংগঠন যেমন—বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ বিশাল ও সমপ্রসারিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করছে। যদিও এইগুলি অরাজনৈতিক সংগঠন, তবে তারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষশক্তি, ভারতপন্থি ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগপন্থি। এই সংগঠনগুলো এই ধরনের ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার ও সক্রিয়। প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ সরকার এখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা বাস্তবায়নকারী কমিটিতেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করেছে।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : ফাইজুল ইসলাম

n লেখক : ইত্তেফাকের নয়া দিল্লি প্রতিনিধি