মোহাম্মদ শাহযাদা
চারুকলা কথাটি শুনলেই রংতুলি ক্যানভাসে তুলির আচড় এসবের এক অজানা সপ্নীল অনুভূতি মনের গভীরে উঁকি দেয়। আর আর্ট মানেই লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁঁকা
মোনালিসা পাবলু পিকাসোর গুয়ের্নিকা জয়নুল আবেদিনের বিদ্রোহ, এস এম সুলতানের বৃক্ষ রোপন ইত্যাদি মনে পড়ে।
আগেকার দিনে শিল্পী তৈরী হতো পারিবারিকভাবে বংশানুক্রমিক। প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষাকেন্দ্রও ছিল না। রাজা বাদশাহর দারবারে ফরমায়েশ চিত্রকর্ম তৈরী করতো তারা । প্রাচীনকালে ছবি আঁঁকা হতো পাহাড়ের গুহায়। মানব সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে শিল্পচর্চার বিকাশ ঘটেছে বর্তমানে চিত্রকলা তথা চারুকলা আধুনিক সংস্কৃতির অন্যতম অংশ।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও চিত্রকলার প্রসার ঘটেছে ধাপে ধাপে । শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের হাত ধরে বাংলাদেশের চিত্রকলা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। যারা সুকুমার বৃত্তিকে চর্চার মাধ্যমে বড় শিল্পী হতে চায়, প্রফেশনাল ডিজাইনার হতে চায় কিংবা ভাস্কর হতে চায় তাদের জন্য চারুকলা পড়াশুনার খোঁজ খবর নিয়ে এই আয়োজন।
চারুকলায় কেন পড়বেন: বিশ্বের সকল দেশেই নন্দনতত্ত্বের বিকাশ ঘটেছে, পাশাপাশি বাংলাদেশেও এর কমতি নেই। যারা ছবি একে শিল্পকে চর্চা করেন তাদের জন্য দেশের বাইরে উচ্চ শিক্ষার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে । এ ছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে হয়ে যেতে পারেন বিখ্যাত শিল্পী। চারুকলা ডিগ্রীধারীদের বাংলাদেশে সরকারি চাকররি সুযোগ কম তবে বেসরকারি পর্যায়ে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আধুনিককালে শিল্পচর্চার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে সফলও হওয়া যায় সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে।
চারুকলা বিষয়ে পড়াশোনা সম্পূর্ণ নিজের কাছে। এখানে প্রতিষ্ঠান কাউকে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দেয় না। তবে অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকদের সান্নিধ্য শিক্ষার্থীর শিল্পী হয়ে ওঠার পথ সহজ করে দেয়।’
নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে চারুকলার শিক্ষার্থীদের পেশাগত সুযোগ খুবই সীমিত। তবে আশার কথা এই যে আমাদের দেশে শিল্পের কদর আগের তুলনায় বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শিল্পকর্মের বাজার মূল্যও সৃষ্টি হয়েছে আমাদের দেশে। এছাড়া আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের প্রতিটি পণ্যেই রয়েছে শৈল্পিক ছোঁয়া। ফলে প্রতিটি পণ্যের উত্পাদনের ক্ষেত্রে একজন শিল্পীর তত্ত্বাবধান প্রয়োজন হয়। এ অর্থে চারুকলার পেশাগত সুযোগ অপরিসীম। বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ছাড়াও দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে চারুকলার পেশাগত সুযোগ। তাছাড়া চারুকলার শিক্ষার্থীরা টিভি চ্যানেল (ইলেকট্রনিক মিডিয়া); দৈনিক, মাসিক, সাপ্তাহিক পত্রিকা (প্রিন্ট মিডিয়া); বিজ্ঞাপনী সংস্থা ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকে। শিল্পকর্ম চর্চা ছাড়াও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে চাকরির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে এই চারুকলা ডিগ্রিধারীদের। দেশের বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অনেক ভালো সুযোগ রয়েছে যা চারুশিল্পীদের সহজেই অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দেয়। এছাড়া ইচ্ছে করলে কেউ নিজেই একটি ক্রিয়েটিভ বাণিজিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারেন। যেখানে গ্রাফিক ডিজাইন, ফ্যাশন হাউজ, বুটিক শপ-এর অনন্য উদাহরণ। তবে সবচেয়ে বড় কথা হল একজন চারুকলা শিক্ষার্থীর উদ্দেশ থাকা চাই শিল্পচর্চা করা। দেশের প্রথিতযশা শিল্পীরা নিজ নিজ কর্মের মাধ্যমে সফল হয়েছেন। শিল্প-সংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমে দেশকে ভালোবাসা আত্মনির্ভরশীল হওয়া এবং নিজের প্রতিভা দেশ-বিদেশে তুলে ধরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এখানে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করা যায়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮টি চারুকলা অনুষদ রয়েছে।
যার মধ্যে ১. ড্রয়িং এন্ড পেইন্টিং ২.গ্রাফিক ডিজাইন ৩.প্রিন্ট মেকিং ৪.প্রাচ্যকলা ৫. ভাস্কর্য ৬.সিরামিক, ৭.কারুশিল্প ও ৮.শিল্পকলার ইতিহাস।
ভর্তির ডোগ্যতা: এইচএসসি পাস
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : রাজশাহী চারুকলা বিভাগ
চারুকলা বিভাগে ৪ বছর মেয়াদি অনার্স ১ বছর মেয়াদি মাস্টার্স ডিগ্রী প্রদান করা হয়। এইচএসসি পাশের পর ভর্তির নিয়ম অনুযায়ি শিড়্গার্থী ভর্তি হয়।
এছাড়া এ বিভাগ থেকে এমফিল ও পি এইচ ডি করার সুযোগ রয়েছে।
এখানে শিল্পকলার ইতিহাস বাদে বাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত সিমীত আসন সংখ্যা ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ৭ টি বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: চারুকলা ইনস্টিটিউট
চবি চারুকলা বিভাগ ও সরকারি চারুকলা কলেজ একীভুত হয়ে এই ইনস্টিটিউট গঠিত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১১ মার্চ চবি সিন্ডিকেট সভায় ইনস্টিটিউট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এর প্রায় এক দশক পর ২০১০ সালের ২ অগাস্ট নগরীর বাদশা মিয়া সড়কের চারুকলা কলেজ ক্যাম্পাসেই এর যাত্রা শুরু হয়। এখানেও অনার্সসহ মাস্টার্স করার সুযোগ রয়েছে।
কোথায় কোথায় চারুকলা বিষয়ক পড়ালেখা করতে পারবেন-
একটি কথা জানা প্রয়োজন যে, চারুকলায় যারা পড়তে চান তাদের অবশ্যই ড্রইং জানা জরুরি। শিল্পমনা থাকলে ছোটবেলা থেকে যারা আর্ট বা আঁঁকাআঁঁকি করেন মনের মধ্যে এক ধরনের আর্ট বা শিল্পবোধ কাজ করে তারাই চারুকলায় ভালো করবেন। চারুকলায় একটি সৌখিন বিষয় যা জোর করে মুখস্থ করে সম্ভব নয়।
১. ঢাকা বিশ্ববিশ্বদ্যালয় চারুকলা অনুষদ (অনার্স, মাস্টার্স), ২. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগ (অনার্স, মাস্টার্স), ৩. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগ (অনার্স, মাস্টার্স), ৪. কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় (ত্রিশাল) চারুকলা বিভাগ (অনার্স), ৫. খুলনা চারুকলা ইনস্টিটিউট (অনার্স), ৭.জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও অনার্স কোর্স চালু হয়েছে ৮. ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (অনার্স, মাস্টার্স), ৯. শান্তমারিয়ম ক্রিয়েটিভ আর্ট এন্ড ডিজাইন, ১০. নারায়ণগঞ্জ আর্ট কলেজ (অনার্স), ১১. রাজশাহী আর্ট কলেজ বিএফএ কোর্স, ১২. বগুড়া আর্ট কলেজ (বগুড়া) বিএফএ কোর্স, ১৩. যশোর আর্ট কলেজ বিএফএ কোর্স, ১৪. ময়মনসিংহ আর্ট কলেজ বিএফএ কোর্স।
এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে চারুকলা শিক্ষার কলেজ গড়ে উঠেছে। এই কলেজগুলোতে ভর্তি হতে হলে এসএসসি পাসের পর কলেজের নিয়ম অনুযায়ী ভর্তি হতে হবে।
চারুকলা পড়া যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে
বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট বা বিভাগ এবং আর্ট কলেজের পাশাপাশি এখন কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে হলোঃ ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা) ও শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি।
