শুধুমাত্র নানা দেশের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণ এবং নানা ধরনের ক্রীড়া নৈপুণ্যের কারণেই নয়, বরং আয়োজনের বিশালতার দিক থেকেও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ এক আয়োজন বা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ নামে পরিচিতি রয়েছে অলিম্পিকের। আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া আয়োজনের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে অলিম্পিক মশাল বা অলিম্পিক শিখার নামটি। প্রতি অলিম্পিকের আগে একটি মশালের মাথায় জ্বলতে থাকা অগ্নিশিখা নানা জায়গা ঘুরে উপস্থিত হয় যে শহরে অলিম্পিক হবে সেখানে। অলিম্পিকের অমর চেতনার প্রতীক এই শিখার যাত্রা শেষ হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, স্টেডিয়ামের চূড়ায় অলিম্পিক মশাল প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে। এর পর ১৪ দিন ধরে তা জ্বলতে থাকে। নেভানো হয় অলিম্পিকের শেষ দিন। ঠিক কবে কোথা থেকে এই অলিম্পিক শিখা প্রজ্জ্বলনের সূত্রপাত হয়েছিল তা জানতে আমাদের চোখ রাখতে হবে অলিম্পিকের ইতিহাসের একেবারে গোড়ার দিকে পশ্চিম গ্রিসের অলিম্পিয়ায়। এখানেই প্রায় তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন অলিম্পিকের সূচনা হয়েছিল যেখানে ঘণ্টাখানেকের একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো থেকে জ্বালানো হয় সেই অগ্নিশিখা, যা ক্রীড়াানুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত কখনোই নেভানো হতো না। আর সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতাতেই এখনো এখানেই অলিম্পিকের কয়েক মাস আগে অনুষ্ঠিত হয় শিখা প্রজ্জ্বলনের অনুষ্ঠান। উপস্থিত থাকেন অলিম্পিক আয়োজক কর্মকর্তারা, ক্রীড়াবিদ এবং কিছু দর্শক। অন্যদিকে ১৯২৮ সালের আমস্টার্ডাম অলিম্পিক থেকে এই অলিম্পিক মশাল জ্বালানোর প্রথা শুরু হয়। তবে এ যুগে যেভাবে গ্রিস থেকে এই অগ্নিশিখা দীর্ঘ পথ ঘুরে হাত বদল হতে হতে অলিম্পিক স্টেডিয়াম পর্যন্ত পৌঁছায় সেই ‘টর্চ রিলে’ প্রথা অবশ্য শুরু হয় ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক থেকে। চলার পথে মশালের আগুন যে কখনোই নেভে না তা পুরোপুরি ঠিক নয়। কখনো কখনো তা নিভে যায় ঠিকই, কিন্তু মশালবাহীরা সঙ্গে রাখেন ওই একই আগুনে জ্বালানো একটি ছোট্ট লণ্ঠন —যা থেকে আবার মশাল জ্বালিয়ে নেওয়া হয়। সাধারণত অলিম্পিয়ার মতো করেই এগারোজন মহিলার মধ্যে থেকে একজন শিখা প্রজ্জ্বলন করেন। এরপর তা থেকে জ্বালানো হয় আরেকটি অলিম্পিক মশাল—যা তুলে দেওয়া হয় একজন ক্রীড়াবিদের হাতে। এ ছাড়াও তুলে দেওয়া হয় একটি জলপাই গাছের শাখা। আরেকজন উড়িয়ে দেন একটি সাদা পায়রা, যা শান্তির প্রতীক। প্রাচীনকালের অলিম্পিকে ইভেন্টের মধ্যে থাকত দৌড়, মুষ্টিযুদ্ধ, কুস্তি, রথচালনা ইত্যাদি। প্রতিযোগিতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জ্বলত একটি আগুনের শিখা, যা ছিল দেবতাদের রাজা জিউসের কাছ থেকে প্রমিথিউসের আগুন চুরি করে মানুষকে দিয়ে দেওয়ার কাহিনীর স্মারক। বর্তমানের অলিম্পিক মশাল সেই ঐতিহ্যেরই এক ধারাবাহিকতা।
