আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংকটের স্বরূপ

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৫৪

রাষ্ট্র যা আদর্শ জ্ঞান করে তাই রাষ্ট্র ও তার জনগণের জন্য পরম সত্য বা বাস্তব। শিল্পবিপ্লব ও ফরাসিবিপ্লব পরবর্তী সময়ে ইউরোপে জাতি-রাষ্ট্রভিত্তিক আদর্শের প্রসার গুরুত্ব লাভ করে। এ আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে উঠে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। অপরদিকে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ যখন উগ্র জাতীয়তাবাদে পরিণত হয় তখন জন্ম নেয় বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের। পরবর্তী পর্যায়ে শ্রেণিবাদী ভাবধারার প্রসার জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের মূলে কুঠারাঘাত হানে। শ্রেণিবাদী তাত্ত্বিকরা রাষ্ট্রব্যবস্থা বিশ্লেষণ করেন শ্রেণিতত্ত্বের আলোকে, জাতিতত্ত্বের আলোকে নয়। এ শ্রেণিতত্ত্বের অন্যতম পুরোধা ছিলেন কার্ল মার্কস। তার মতে শিল্প-সভ্যতার অনিবার্য পরিণতি হিসাবে পুঁজিবাদের পতন ঘটবে এবং জন্ম নিবে সমাজতন্ত্রের। এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর শেষ পর্যায়ে কমিউনিজম বা সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে।

অপরদিকে ঊনিশ শতকে মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের বিপরীতে পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অমার্কসীয় সমাজতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল ফেবিয়ান সমাজতন্ত্র। ১৮৮৪ সালে চার্লস রিড ও এডওয়ার্ড পিজের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডে ফেবিয়ান সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর লোকেরা তখন ফেবিয়ান সমাজবাদী ভাবধারার নেতৃত্ব দিতেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সিডনি ওয়েব, জর্জ বার্নার্ড শ’, এইচ.জি.ওয়েলস, গ্রাহাম ওয়ালাস ও হ্যারল্ড লাস্কি। এদের প্রভাবেই ফেবিয়ান সমাজতান্ত্রিক আদর্শের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে। কয়েকটি বিষয়ে তারা মার্কসের আদর্শের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। তারা সংসদীয় আইনের পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন। এছাড়া বৈপ্লবিক পন্থায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার কথা অস্বীকার করতেন। একুশ শতকের শুরু থেকে ব্রিটিশ লেবার পার্টি ফেবিয়ান ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন করেন। ব্রিটেনে শিল্প, কল-কারখানা, ব্যাংক ইত্যাদি জাতীয়করণ করা হয়েছে ফেবিয়ান সমাজবাদের ভিত্তিতে। এই মতবাদের প্রভাব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিশেষত ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমানে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। মতামত প্রকাশ প্রত্যেক ব্যক্তির সার্বভৌম অধিকার। ব্যক্তির এ অধিকার রাষ্ট্র ক্ষুণ্ন করতে পারে না যদি তার মতামত ও কার্য দ্বারা অপরের ক্ষতি না হয়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অন্যতম প্রবর্তক জন স্টুয়ার্ট মিলের মতে : “মাত্র একজন বাদে সমগ্র মানবজাতি যদি কোন একটি মত পোষণ করে তাহলেও এই একজনের ভিন্নমত স্তব্ধ করে দেবার অধিকার মানবজাতির নেই।” যে সমাজে বৈচিত্র্য ও মুক্তবুদ্ধির মূল্য দেয়া হয় না সেখানে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার সার্থকতা লাভ করে না। জনগণের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন ব্যতিরেকে বস্তুবাদের যান্ত্রিক প্রয়োগ সামাজিক অগ্রগতির পক্ষে সহায়ক হতে পারে না।

বর্তমানে বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেসব সংকট দেখা যাচ্ছে তার অন্যতম কারণ হচ্ছে আদর্শগত শূন্যতা ও আদর্শগত দ্বন্দ্ব্ব। অধিকাংশ রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেখা যায় যে,শাসন ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি বা কতিপয় ব্যক্তির হাতে চলে যায় এবং তাদের অপশাসনের ফলাফল সবাই ভোগ করে। গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক উভয় শাসন ব্যবস্থায়ই এ কথা সত্য। উভয় শাসন ব্যবস্থায় শাসকদের দায়িত্ব, কর্তব্য, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সরকারের সমালোচনা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নীতিগত পার্থক্য থাকে, কিন্তু উভয় ক্ষেত্রে শাসকবর্গ যেভাবে ক্ষমতার ব্যবহার ও প্রয়োগ করে তাতে কোনো পার্থক্য থাকে না। চীন, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, কিউবাতে সমাজতন্ত্রের নামে যে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে, তা দেখে সমাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের ক্রমশ অনীহা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটল, তখন পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো মনে করতে শুরু করল তাদের আদর্শের বিজয় হয়েছে। বিখ্যাত দার্শনিক ফ্রান্সিস ফোকিয়ামা এটাকে বলেছিলেন ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’। তখন থেকেই তারা তাদের আদর্শকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এবং তা চাপিয়ে দেওয়া গোটা বিশ্বের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করতে লাগল। এ কারণে তারা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন অজুহাতে সামরিক অভিযান শুরু করে। “ইসলামিক হুমকি” বা “মুসলিম ক্রোধের” কথা বলে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে তেল,গ্যাস ও খনিজ সম্পদ দখল করা শুরু করে। অপরদিকে এসব দেশে স্বৈরশাসকদের অপশাসনের ফলে সাধারণ জনগণ বিভিন্ন সময় সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত থাকে। এ সুযোগ বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপকে অবধারিত করে তোলে।

ইসলামকে হুমকি হিসাবে দেখার পশ্চিমা প্রবণতার কারণে মুসলিম বিশ্বের অনেক সরকারই ইসলামিক রেডিক্যালিজম বা ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের হুমকিকে ইসলামি মৌলবাদ, ইসলামিজম, রাজনৈতিক ইসলামের সঙ্গে এক করে ইসলামি আন্দোলনসমূহকে দমন বা নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে ব্যবহার করে থাকে। তারা নিজেদের দেশে এবং পশ্চিমা বিশ্বে এক একরৈখিক ইসলামি রেডিক্যালিজমের ভীতি ছড়িয়ে দেয়। ঠিক অতীতে যেমন অনেকে স্বৈরাচারী শাসনকে বৈধ করা ও পশ্চিমা শক্তির সমর্থন লাভের জন্য কমিউনিজম বিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখা যায় পাশ্চাত্যের প্রতি মুসলিম বিশ্বের অনেক জনগণের একরৈখিক মনোভাব ও তাদের সব সমস্যার জন্য ইউরোপ ও আমেরিকাকে দায়ী করার প্রবণতা। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে পরস্পরকে প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখার মনোভাব। ঘনীভূত হচ্ছে রাজনৈতিক সংকট।

আদর্শের সংঘাত ও আদর্শগত শূন্যতার কারণে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেসব সংকট সৃষ্টি হচ্ছে তার অন্যতম সমাধান হচ্ছে প্রত্যেক রাষ্ট্রের নিজস্ব আদর্শের বাস্তবায়ন। আদর্শবান নেতা ও আদর্শ নেতৃত্ব সৃষ্টি করে সবার কল্যাণে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত ও নবায়ন করতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়