শতাব্দীর সেরা ‘আত্মসমর্পণ’ চুক্তি

আপডেট : ২১ মে ২০১৯, ২১:২৫

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনাকে ‘একটি আত্মসমর্পণের দলিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ মালকি। তিনি বলেন, এই দলিলে ফিলিস্তিন কখনো স্বাক্ষর করবে না। তিনি আরো বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড  ট্রাম্প শান্তি পরিকল্পনাকে ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু আমাদের মতে, এটা শতাব্দীর সেরা আত্মসমর্পণ চুক্তি। অন্য ভাষায়, ফিলিস্তিনিদের উত্সর্গের শতাব্দীর সেরা ভাগ্য পরীক্ষা। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ইসরাইলের উপনিবেশিক নীতিকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জন্য চুক্তির কথা বলছে। শান্তি চুক্তি যখন সকলের কাছে প্রাধান্য অর্জন করছে, যখন বিশ্ব একজন বেপরোয়া ড্রাইভারের কাছে এর পরিচালনা ন্যস্ত করেছে। আমরা অপেক্ষা করছি এটা দেখতে যে কখন এই বেপরোয়া ড্রাইভার ফিলিস্তিনি জনগণের উপর দিয়ে গাড়িটি পরিচালনা করে।’ জাতিসংঘ নিযুক্ত প্রতিনিধি ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেন যে, মার্কিন শান্তি পরিকল্পনায় দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা না থাকলে রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত যুক্তরাষ্ট্রকে উপযুক্ত জবাব দেওয়া।

এই মাসের প্রথম দিকে ট্রাম্পের জামাতা এবং হোয়াইট হাউজের সিনিয়র এডভাইজার জারেদ কুশনার বলেছেন, ‘চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে উভয়পক্ষ অনেক ভালো থাকবে’। কুশনারকে এই চুক্তির মূল উদ্যোক্তা বলে মনে করা হচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে তিনি পরিচিত। ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তিনি মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক দাবা খেলার নায়ক বলে খ্যাতি পেয়েছেন। পরিকল্পিত ফিলিস্তিন-ইসরাইল শান্তি চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রকাশ করা হয়নি। রমজান মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর, আগামী মাসে চুক্তিটি সরকারিভাবে ঘোষণা করার কথা রয়েছে। কিন্তু তার আগেই ৭ মে ২০১৯ ইসরাইলের একটি পত্রিকা চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ ফাঁস করে দেয়। প্রকাশিত চুক্তির বিবরণী দেখে অনুমিত হচ্ছে যে, ঐ চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির মৌলিক নীতি ‘দুই রাষ্ট্রে’র ধারণার পরিবর্তে ইসরাইলের ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ চাপিয়ে দেওয়ার ফর্মুলা রয়েছে। ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরে নানাবিধ কৌশল ও পরিকল্পনা করে আসছে। ১৯৪৮ সালে জোরপূর্বক ফিলিস্তিনের মাটিতে ইসরাইল নামক অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর একদিনের জন্যও সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংগঠিত চার চারটি যুদ্ধে প্রকারান্তরে ইসরাইলের সীমানা সম্প্রসারিত হয়েছে। ফিলিস্তিনি জনগণ নিজেদের বাসভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের অস্তিত্বের রক্ষক হিসেবে কাজ করেছে। কখনো কখনো ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে শান্তির দূত হিসেবে অবির্ভূত হয়েছে। জাতিসংঘের প্রস্তাবনায় ‘দুই রাষ্ট্র’ প্রস্তাবনাকে অনুমোদন করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইসরাইলকে তোষণ করলেও কখনো দুই রাষ্ট্র পরিকল্পনাকে অস্বীকার করেননি।

এখন ইসরাইলের কট্টর সমর্থক ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর আন্তর্জাতিক আইনকানুন ও রীতি-রেওয়াজ অস্বীকার করে দুই রাষ্ট্রের পরিকল্পনার পরিবর্তে ‘একক রাষ্ট্রের’ কথা বলছে। ইতিপূর্বে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিলিস্তিন বিরোধী বিবিধ কার্যক্রম সমর্থন করেছেন। অতিসম্প্রতি, তিনি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর সাথে একটি তথাকথিত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। চুক্তিটির নাম দেওয়া হয়েছে, ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা শতাব্দীর সেরা চুক্তি।  

চুক্তির বিস্তৃত বিবরণ যা ইসরাইলি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তার বিবরণ নিম্নরূপ: ক. মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন নামে কোনো দেশ থাকবে না। এর নতুন নাম হবে নিউ প্যালেস্টাইন। চুক্তিতে ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব বা জনগণের সম্মতি বা সংলাপের কোনো অবকাশ রাখা হয়নি। বরং প্রকাশিত চুক্তিতে দেখা যায়, এই চুক্তি না মানলে প্রয়োজনে ইসরাইল ফিলিস্তিনি নেতাদের হত্যা করতে পারবে। খ. ইসরাইল পিএলও এবং হামাসের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। গাজা উপত্যকা, যিহুদিয়া পার্বত্য এলাকা এবং পশ্চিম তীরের সামারিয়া এলাকা নিয়ে গঠিত হবে এই রাষ্ট্রটি। তবে, পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতিগুলোর উপর  এই রাষ্ট্রের কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। এখানে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক থাকবে ইসরাইল। গ. চুক্তি অনুযায়ী জেরুজালেম নগরী ভাগ হবে না। এটি হবে উভয় দেশের রাজধানী। নগরীর আরব বাসিন্দারা নতুন রাষ্ট্রের নাগরিক হবেন। ইহুদিরা ইসরাইলি নাগরিক হিসেবে সেখানে বসবাস করবেন। ইহুদিরা আরবদের এবং আরবরা ইহুদিদের বাড়িঘর কিনতে পারবেন না। জেরুজালেমে নতুন আর কোনো এলাকা দখল করা হবে না। ঘ. জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলো বিদ্যমান অবস্থায় বজায় থাকবে। তবে, এর নিয়ন্ত্রণ থাকবে জেরুজালেম পৌরসভার হাতে। পৌরসভার সার্বভৌমত্বের মালিক হবে ইসরাইল। ঙ. জেরুজালেমের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। জেরুজালেম পৌরসভার কাছে ট্যাক্স ও পানির বিল প্রদান করবে কথিত নিউ প্যালেস্টাইন সরকার। চ. ফিলিস্তিনের জন্য একটি বিমানবন্দর নির্মিত হবে। জমি দেবে মিসর সরকার। কলকারখানা নির্মাণ, বাণিজ্যিক ও কৃষিখাতে ব্যবহারের জন্যও নতুন ভূখণ্ড দেবে মিসর। তবে, ফিলিস্তিনিরা এখানে বসবাসের সুযোগ পাবে না। লিজ বাবদ মিসরকে মূল্য পরিশোধ করবে নিউ প্যালেস্টাইন সরকার। কি পরিমাণ অর্থ এসবের জন্য দিতে হবে তা নির্ধারণ করবে মধ্যস্থতাকারী আরব দেশগুলো। ছ. চুক্তি বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো। নিউ প্যালেস্টাইনের বিভিন্ন প্রকল্পে ৩০ বিলিয়ন ডলার দেবে মার্কিন মিত্ররা। এর আওতায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে থাকা ইহুদি বসতিগুলো ইসরাইলের সাথে যুক্ত থাকবে। আন্তর্জাতিক সহযোগীরা যে অর্থ দেবে তার ২০% যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০% এবং বাকি ৭০% যোগাবে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো। তেল বিক্রির অর্থ থেকে তারা এই সহায়তা দেবে। জ. চুক্তি বাস্তবায়নের আর্থিক বোঝা আরব দেশগুলোকেই বইতে হবে। ঝ. নিউ প্যালেস্টাইনের কোনো সামরিক বাহিনী থাকবে না। দেশটির পুলিশকে কেবল হালকা অস্ত্র বহনের অনুমতি দেওয়া হবে। পরিকল্পিত চুক্তি অনুযায়ী দেশটিকে বিদেশি আগ্রাসন থেকে রক্ষায় ইসরাইলকে অর্থ দিতে হবে এই নিউ প্যালেস্টাইনের। কি পরিমাণ অর্থ দিতে হবে তা নির্ধারণ করবে মিত্র রাষ্ট্রগুলো। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর ফিলিস্তিনের গাজা নিয়ন্ত্রণকারী ‘হামাস’ তার সব অস্ত্র মিসরের কাছে জমা দিতে হবে। সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত হামাসের নেতাকর্মীরা সহযোগী দেশগুলোর কাছ থেকে বেতনভাতা পাবেন।

রাষ্ট্র গঠনের এক বছরের মাথায় নিউ প্যালেস্টাইনে নির্বাচন হবে। এর মধ্য দিয়ে একটি নতুন সরকার কথিত নিউ প্যালেস্টাইনের ক্ষমতার মালিক হবে। ঞ. নিউ প্যালেস্টাইন ও ইসরাইলের সীমান্ত জনগণের চলাচল ও পণ্য পরিবহনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। নতুন রাষ্ট্রের পশ্চিম তীর ও গাজার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে মহাসড়ক নির্মাণ করা হবে। এর অর্ধেক খরচ দেবে চীন। বাকি ৫০% অর্থের যোগান দেবে দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ট. চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হামাস ও পিএলও - যদি এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তবে মার্কিনীদের দেয়া সহায়তা বন্ধ করা হবে। একই সাথে অন্য কোনো দেশও যাতে অর্থ সহায়তা দিতে না পারে তা নিশ্চিত করা হবে। তাছাড়া, ফিলিস্তিনের ক্ষমতাসীন দল পিএলও যদি এ চুক্তি মেনে না নেয় এবং হামাস ও ইসলামিক জিহাদ যদি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে তাহলে এই দুইটি দলের নেতাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে গাজা উপত্যকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে ইসরাইল। এই যুদ্ধে ইসরাইলের পক্ষ নেবে যুক্তরাষ্ট্র।

ট্রাম্পের এই অযৌক্তিক, অবাস্তব ও অবমাননাকর চুক্তি মেনে নিতে ইসলামের পবিত্র দুই নগরীর কথিত ‘খাদেম’ সৌদি সরকার তথা যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান ফিলিস্তিন ও ইসরাইল বিরোধী রাষ্ট্রগুলোকে অব্যাহত চাপ দিয়ে যাচ্ছে বলে মিডল ইস্ট মনিটরে বলা হয়েছে। ট্রাম্পের প্রস্তাব মেনে নিলে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টকে ১০ বিলিয়ন ডলার তহবিলের প্রস্তাব দিয়েছেন সৌদি এই যুবরাজ। ট্রাম্পের পরিকল্পনা মেনে নিতে না পারলে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাও ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ। ইসরাইলি পত্রিকা হাওম ডেইলি জানিয়েছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও জর্ডান এই ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ কে সমর্থন জানিয়েছে। এসব দেশের কর্মকর্তারা জানান, সৌদি আরব, আমিরাত, মিসর ও জর্ডান ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে তাদের সমর্থনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এসব কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনের শান্তি পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের অনীহারও সমালোচনা করেছেন।

এর পূর্বে ফিলিস্তিনি স্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন প্রশাসন ফিলিস্তিনি জনগণের আস্থা হারিয়েছে। সম্পদ সহায়তার যে পরিকল্পনা ট্রাম্প পেশ করেছেন, তার সিংহভাগ অন্য রাষ্ট্র-শক্তির ঘাড়ে চাপিয়েছেন। এই চুক্তি প্রণয়নের আগে ফিলিস্তিনি জনগণ, তাদের প্রতিনিধি অথবা নেতৃত্বের সাথে কোনো রকম আলোচনা করেছেন-এ রকম তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং, চুক্তিটি আরোপিত ও শক্তিমদমত্ততা প্রসূত। ট্রাম্প যেমন অন্যান্য কার্যক্রমের দ্বারা মার্কিন জাতিকে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন, তিনি এখন তার এই প্রস্তাবিত চুক্তি দ্বারা গোটা মুসলিম বিশ্বের কাছে সমালোচিত হয়েছেন।

n লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়