সকল দলের অংশগ্রহণে একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আহবান জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি এ আহবান জানান। সিইসির এ ভাষণ দেশের প্রায় সব ইলেক্ট্রনিক প্রচার মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়।
জাতির উদ্দেশে সিইসি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সকল রাজনৈতিক দল এগিয়ে আসবে এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সকলের অংশ গ্রহণে একটা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জনগণ তাদের রায়ের প্রতিফলন দেখতে পাবেন। এজন্য সকল রাজনৈতিক দলের কাছে বার বার অনুরোধ জানিয়েছি, তারা যেন জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে দেশে শান্তি বজায় রাখতে একটা সমঝোতায় আসেন। গত ১৯ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত্ করেও আমরা তাকে অনুরোধ জানাই, তিনি যেন ব্যক্তিগত বিশেষ উদ্যোগ নেন এই অচলাবস্থা দূরিকরণে। আমরা এখনও আশা রাখি, জনগণের এ প্রত্যাশা উপেক্ষা করবেন না কেউই। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা। আমরা সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য শপথ নিয়েছি। সংবিধান মোতাবেক আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন করার বাধ্য বাধকতা রয়েছে। এতদিন আমরা অপেক্ষা করেছিলাম একটা রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য। আমাদের হাতে বিলম্ব করার মতো সময় আর নেই।
নির্বাচনকালীন আচরণবিধি প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, সংশোধিত আচরণবিধিতে তফসিল ঘোষণার দিন থেকে নির্বাচন পূর্ব সময় শুরু হবে এবং নির্বাচনের ফলাফল গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে। এতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলের নেতা, মন্ত্রীবর্গ এবং সরকারি সুবিধাভোগী অন্যান্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার দিন থেকে সরকারি সুযোগ সুবিধা নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করতে পারবেন না। তবে প্রাপ্যতা অনুযায়ী তারা নিরাপত্তা পাবেন। সংসদ সদস্যগণ বা তাদের কোন প্রতিনিধিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বে থাকলে নির্বাচন পূর্ব সময়ে ঐ কমিটির কোন সভায় যোগ দিতে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত থাকতে পারবেন না। তারা তাদের ইচ্ছাধীন তহবিল বা তাদের অধীনস্থ অন্য কোন তহবিল থেকে কোন অর্থ কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করতে পারবেন না। তারা নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি সুযোগ সুবিধাসহ সরকারি যানবাহন, সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের ব্যবহার করতে পারবেন না। এ ছাড়াও পূর্বের সকল বিধি নিষেধও বলবত্ থাকবে। নির্বাচনি আচরণবিধি প্রয়োগে কোন ছাড় দেয়া হবে না। কে কোন পদে আছেন- তা দেখা হবে না। তিনি কোন আচরণবিধি ভঙ্গ করলেন শুধু সেটাই দেখা হবে এবং সে মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আশা করি সকল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীগণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীগণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আচরণবিধির প্রতিটি অনুশাসন নিজেরা মেনে চলবেন এবং তাদের সমর্থকদেরও মেনে চলতে বাধ্য করবেন।
নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলার বিষয়ে তিনি বলেন, একই দিনে সারা দেশে ৩০০ সংসদীয় আসনে নির্বাচনের এ বিরাট কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করা অতি দুরূহ। তাই প্রতিবারের মতো এবারও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, ভিডিপি, আনসার, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড বাহিনীর সাথে সশস্ত্র বাহিনীকেও নির্বাচনের জন্য দেশব্যাপী মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। নির্বাচনি দায়িত্ব পালনরত সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকল কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হবে। নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এ নির্দেশিত বিধানাবলী প্রয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করবো না।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, দেশের উন্নতির জন্য, দেশবাসীর শান্তির জন্য, গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য আপনারা সমঝোতায় আসুন। দেশবাসীর কল্যাণের উপর আর কিছুই প্রাধান্য পেতে পারে না। একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য রাষ্ট্রপতি, নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন অঙ্গীকারাবদ্ধ। দেশের সকল ভোটারকে আমি আশ্বাস দিতে চাই যে, আপনারা যাতে ঘর থেকে বেরিয়ে নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যেতে এবং ভোট প্রদান করে নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরে আসতে পারেন সে ব্যাপারে যা যা করা দরকার আমরা তাই করব। কোনভাবেই সন্ত্রাস, মাস্তানি বা পেশী শক্তির কাছে সাধারণ ভোটারদের জিম্মি হতে আমরা দেব না। শান্তিপূর্ণ অবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে।
আগামী ৫ জানুয়ারি সকল রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ছাত্রসহ সকল শ্রেণীর মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এবং নির্বাচনের সাথে সম্পৃক্ত সকল শ্রেণির সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় একটি আনন্দঘন পরিবেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এ আশা ব্যক্ত করছি। সর্বশেষে আমি ব্যক্তিগতভাবে সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করব।
