দানবদের দমন করা দরকার

আপডেট : ২১ মে ২০১৯, ২১:২৫

পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ মানুষের চোখে মোনালিসা সব থেকে বিখ্যাত এবং বিশ্বখ্যাত শিল্পকর্ম। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অমর সৃষ্টি মোনালিসা এখন যদিও প্যারিসের ল্যুভরে সংরক্ষিত আছে কিন্তু এই বিস্ময়কর শিল্পকর্মের অবস্থাও সবসময় সুপ্রসন্ন ছিল না। ভিন্সেঞ্জো পেরুজ্ঞিয়া নামের গ্যালারির এক কর্মচারী দিনের আলোতে মোনালিসা চিত্রকর্মটি সুকৌশলে চুরি করে নিয়ে যায় এবং ইতালিতে পাচার করে দেয়। সেখানে এটি অনেকদিন ছিল। যদিও সে পরে ধরা পড়ে যায় কিন্তু তার এমন বিরল নেতিবাচক প্রতিভার জন্য এখনো মানুষ তাকে স্মরণ করে। আমি চোরের পক্ষে সাফাই গাইতে বসিনি বরং বোঝার চেষ্টা করছি চোর কথাটা  আজকের দিনে কতটা গ্রহণযোগ্য। একসময় বলা হতো চুরি এরপর এসেছে পুকুরচুরি। আগে চোরদের খুব সহজে চেনা যেত কিন্তু এখন আর চোরদের চেনা যায় না কিংবা চেনাটা এতো সহজ নয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এদের ভদ্র একটা নাম দেওয়া হয়েছে। এদের বলা হচ্ছে দুর্নীতিবাজ আর চুরির নতুন সংস্করণ হয়েছে দুর্নীতি হিসেবে। দুর্নীতিকে নির্মূল করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণীত হয়। এই জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের মুখবন্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বরে ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উত্পাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না— চরিত্রের পরিবর্তন না হলে এই অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে না। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার ঊর্ধ্বে থেকে আমাদের সকলকে আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি করতে হবে।’ সমাজের সর্বস্তরে প্রবাহমান একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবিরোধী সাংস্কৃতিক চর্চা এবং এর প্রসার সুনিশ্চিত করার রূপকল্প নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও দুর্নীতিকে কোনোভাবে রোধ করা যাচ্ছে না। তাহলে কি দুর্নীতি নিয়ে আমাদের ভাবনার পরিবর্তন দরকার, নাকি দুর্নীতির শেকড় বের করে তা উপড়ে ফেলা দরকার। হয়ত দুটোই কিংবা কোনোটাই নয়। কারণ দুর্নীতি নিয়ে আমাদের গবেষণা নেই। দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব তৈরির প্রচেষ্টা নেই। যে মানুষটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছে সে-ই আবার দুর্নীতির সঙ্গে আপস করছে কিংবা দুর্নীতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে। কিংবা কোনো না কোনোভাবে অন্যকে দুর্নীতি করতে প্রভাবিত করছে। তাহলে কীভাবে আমরা দুর্নীতিকে প্রতিরোধ করব। সাম্প্রতিক সময়কে বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিবাজদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। যারা বিভিন্নভাবে যোগসাজশ করে নিয়োগ ও টেন্ডারে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে দুর্নীতিতে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে বেশিরভাগ মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। কিন্তু তারা দুর্নীতিবাজদের বিপক্ষে অবস্থান না নিয়ে নিরপেক্ষ একটি অবস্থান তৈরি করেছে। এদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পাপকে ঠেকাবার জন্য কিছু না করাই তো পাপ’ এই গোত্রের মধ্যে ফেলা যায়। কিছু সাহসী মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও দুর্নীতিবাজদের অবৈধ আর্থিক ক্ষমতার প্রয়োগে বিভিন্নভাবে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রায় সব জায়গায় দেখছি দুর্নীতিবাজদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য একটি অশুভ শক্তির মাতামাতি। কারণ এদের ক্ষমতায় বসালে তাদের মাথায় কাঠাল ভেঙে খাওয়া সহজ হবে। আমাদের এটা মনে রাখতে হবে চোর-বাটপার ও দুর্নীতিবাজদের যত বেশি পদায়ন করা হবে দেশ ততো বেশি পেছাবে। এদের চরিত্র ও আচরণকে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ও মোশতাকের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। যেহেতু বেশিরভাগ দুর্নীতি নিয়োগ ও টেন্ডারকে কেন্দ্র করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দানা বাঁধছে, এজন্য সরকারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দুটোর দায়িত্ব নিতে হবে। এজন্য সরকার কেন্দ্রীয় নিয়োগ কাউন্সিল ও জাতীয় টেন্ডার ইভালুয়েশন কমিশন গঠন করতে পারে। সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ সকলের নিয়োগ প্রক্রিয়া পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আদলে এই কেন্দ্রীয় নিয়োগ কাউন্সিলের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কেবল তাদের জনবল চাহিদার বিষয়টি কেন্দ্রীয় নিয়োগ কাউন্সিলকে জানাবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে কেন্দ্রীয় নিয়োগ কাউন্সিল। একইভাবে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে যে প্রকল্পগুলো রয়েছে, সে প্রকল্পসমূহের ইজিপিসহ টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিবে জাতীয় টেন্ডার ইভালুয়েশন কমিশন। এতে করে দমন করা সম্ভব হবে। এর ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্নীতিতে জড়ানোর সম্ভাবনা থাকবে না বলে প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সেবা সম্পৃক্ত কাজে নিজেদের পুরোপুরিভাবে আত্মনিয়োগ করতে সক্ষম হবে। দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না বলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকার থেকে নিয়োগ পাবার জন্য উপরের পদগুলোতে দুর্নীতিবাজ চক্রের প্রভাব ও অশুভ গ্রুপিং-লবিংয়ের প্রভাবও কমে আসবে।

n লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর