আমাকে পাহাড় না সমুদ্র কে বেশি টানে—এই হিসাব কখন করা হয়নি। তবে সুযোগ পেলেই ছুটে চলি প্রকৃতির পানে। ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘের বন্ধুদের নিয়ে এবার গিয়েছিলাম ভারতের আসাম ও মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী জামালপুর জেলার নয়ন জুড়ানো লাল পাহাড়ের লাউচাপড়া। জায়গাটির নান্দনিকতা, কোমল প্রকৃতির স্নিগ্ধতা তুলনাহীন। লাউচাপড়ায় রয়েছে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো পাহাড়িকা। জামালপুর জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সুউচ্চ টাওয়ার। যেখান থেকে গভীর বনসমৃদ্ধ গারো পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। যত দূর চোখ যায় শুধু সবুজের ঢেউ। আরও রয়েছে গারো আদিবাসীদের গ্রাম দিগলাকোনা। গ্রামের মাতব্বরের নাম প্রীতি সন সারমা। বন্ধুবত্সল, অতিথিপরায়ণ মাতব্বর সাহেবের দেওয়া জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে একটি আবাসিক হোস্টেল। যার নাম সাল গিত্তাল, এর বাংলা অর্থ হচ্ছে নতুন সূর্য/নবদিন। খ্রিস্টান ক্যাথলিক ধর্মের সত্তর জন গারো শিশু সেখানে লেখাপড়া করে, যাদের পরিবার অত্যন্ত গরিব। হোস্টেল ইনচার্জ রেখা দিদির সাথে কথা বলে জানা হলো কত কষ্ট করে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত সাল গিত্তাল হোস্টেলটিকে পরিচালনা করতে হচ্ছে। এত কষ্টের পরেও নিয়মানুবর্তিতায় পরিচালনা করতে পেরে রেখা দিদির চোখে মুখে তৃপ্তির হাসি। শিশুদেরও যথেষ্ট উত্ফুল্ল মনে হলো। শিশুদের স্নেহ মমতায় এমনভাবে নিজেকে জড়িয়েছেন, কখন যে নিজের বিয়ের বয়স পার হয়েছে টেরই পাননি তিনি! দীর্ঘ আলাপচারিতা ও কফি পর্ব শেষ করে বিদায় নিলাম আমাদের রিসোর্টের দিকে। অমাবস্যার অন্ধকার রাতে জোনাকি পোকার আলো সম্বল করে মেঠো পথে হেঁটে চললাম। রিসোর্টে এসে বারবিকিউর আয়োজন হলো। সাদা মনের আক্তার ও ভাবে থাকা এমরানের রেসিপিতে পাহাড়ি মোরগের বারবিকিউ মজা করে খাওয়া হলো। পাহাড়ের পাদদেশের রাত যে এত সুন্দর তা পূর্ণ উপলব্ধি করা গেল দ্বৈবক্রমে জেনারেটর নষ্ট হয়ে যাওয়ায়। বারবিকিউ শেষে আবারও ছুটলাম সুউচ্চ টাওয়ারের চূড়ায় উঠার জন্য। উদ্দেশ্য পাহাড়ের বুকে রাতের নীরবতা উপভোগ করা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টর্চের আলোও ক্ষীণ। টাওয়ারে উঠার গেট লক, তাই গ্রিল বেয়ে প্রবেশ করতে হলো। নাদুস-নুদুস দেহের জন্য কিঞ্চিত্ কষ্ট হলেও আনন্দ পেলাম। চূড়ায় বসে নির্মল বাতাসে সারাদিনের সকল ক্লান্তি নিমিষেই উধাও হলো। কখন যে ঘড়ির কাঁটা রাত দেড়টা ছুঁই ছুঁই হলো টেরই পাইনি। হঠাত্ ফাগুনের হাওয়ায় আমাদের টনক ফিরল। এবার রিসোর্টে ফেরার পালা। মনের আঙ্গিনায় স্মৃতি হয়ে রইল অমাবস্যা রাতে পাহাড়ের আঙ্গিনায় এক অন্য রকম অনুভূতির নীরবতা।
যোগাযোগ :লাউচাপড়া জামালপুর জেলা হলেও শেরপুর দিয়ে যাওয়া সহজ। ঢাকার মহাখালি হতে শেরপুরগামী বাস, সেখান থেকে যেকোনো যানবাহনে লাউচাপড়া যাওয়া যায়। খরচ দু’দিনের জন্য জনপ্রতি দুই হাজার টাকা। লাউচাপড়া সড়ক উন্নয়ন হলে মায়াময় নির্মল বাতাসের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সমাগম বাড়বে। সেই সাথে উন্নতি হবে স্থানীয় উপজাতি ও বাঙালি সম্প্রদায়ের আর্থিক সচ্ছলতা।
আরও কী কী দেখবেন :পাশেই শেরপুর জেলার বিনোদন কেন্দ্র গজনি অবকাশ ও মধুটিলা ইকো পার্ক। নিজস্ব যানবাহন না থাকলে ভাড়ায় খাটা মটর সাইকেল অথবা অটো নিতে পারেন। ভাড়া দরদাম করে নেওয়া ভালো।
রাত্রিযাপনের জন্য শহরে রয়েছে হোটেল সম্পদসহ বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল।
ছবি :দে-ছুট
