ভয়ঙ্করতম ঝঞ্ঝাও একসময় দুর্বল হয়, ভয়াবহতম আগ্নেয়গিরিটিও শান্ত হয়ে যায় একসময়। পোড়া মাটিতেও আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় জীবন। এমন অপরাজেয় জীবন কী ক্রিকেটের সামান্য ধাক্কায় নুইয়ে যেতে পারে! গতকাল বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের দেখে মনে হলো- জীবনের এই অপরাজেয় রূপটা তারা অন্তত বুঝতে পারছেন।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুতপাত, ঝঞ্ঝার প্রকোপের মতো করেই বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে আফগানিস্তানের বিপক্ষে এক পরাজয়। এবার সেই পরাজয়ে পোড়া মাটিতে আরেকবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন অন্তত ক্রিকেটাররা। অনুশীলনের ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের মধ্যে মিটিং, একে অন্যের ভুল ধরিয়ে দেয়া, সূচিকে ছাপিয়ে যাওয়া অনুশীলন কিংবা মনোবিদের সঙ্গে লম্বা সেশন; গতকাল সারাদিন ধরে জীবনের এই জয়গানই গাইলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। এবার লক্ষ্য অধরা পাকিস্তান-বধ দিয়েই বাংলাদেশের ক্রিকেটে আবার প্রাণসঞ্চার করা।
বছরের শুরু থেকে তিন ফরম্যাটে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হার এবং এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে পরাজয়ে এমনিতেই একটু কক্ষচ্যুত হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট। গত এশিয়া কাপ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ, নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইট ওয়াশ করা; সব স্মৃতি যেন পেছনে পড়ে যেতে বসেছিল। আর সবকিছুকেই এক লহমায় মিলিয়ে দিয়েছে আফগানিস্তান-কাণ্ড।
ঠিক এই অবস্থায় বাংলাদেশের আর কিছু হারানোর অবশিষ্ট নেই। ফলে এখন কেবলই সামনে তাকানোর পালা। এই সামনে তাকানোতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে সাকিব আল হাসানের ফেরাটা। দলের এক ঝাঁক সিনিয়র ও পারফমার যখন ইনজুরিতে মাঠের বাইরে, সেই সময়ে নিষেধাজ্ঞা শেষ করে আজ মাঠে ফিরছেন সাকিব।
আগের দিনই পাকিস্তান অধিনায়ক বলেছেন, সাকিবের ফেরাটা বাংলাদেশকে অনেকটাই বদলে দিতে পারে। গতকাল অনুশীলনে বিভিন্ন পর্বে সাকিবের অংশগ্রহণ দেখে বোঝা গেল, তাকে কেন্দ্র করেই নতুন-প্রাণ খুঁজছে বাংলাদেশ।
সকালে অনুশীলনের পাশেই দলের বোলারদের নিয়ে ‘বিশেষ বৈঠক’ আয়োজন করেছিলেন কোচ। এমন বিশেষ বৈঠক দিনভর অনেকগুলোই হলো। প্রায় সবগুলোতেই ‘কমন’ রাখা হলো সাকিবকে। কী কথাবার্তা হলো, দূর থেকে তো বোঝার উপায় নেই। তবে এটুকু দিব্যি বোঝা গেল, সাকিব চেষ্টা করছেন সবাইকে জাগিয়ে তোলার। সতীর্থদের কাছে যে স্বতঃস্ফূর্ততা এবং কমিটমেন্ট খুঁজে ফিরছেন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, সেটাই যেন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
খেলোয়াড়দের অনুশীলনের আচরণও বলে দিল, জরুরি অবস্থাটা তারা বুঝতে পারছেন। সাধারণত বাংলাদেশ দলের অনুশীলন মানেই ম্যাড়-মেড়ে ব্যক্তিগত দক্ষতার চর্চা এবং সবাই মিলে ওয়ার্ম-আপ ও ফিল্ডিং অনুশীলন; কিন্তু কাল দেখা গেল ব্যক্তিগত অনুশীলনেও সমন্বিত প্রয়াস।
কারো ব্যাটিং অনুশীলনের সময় অন্য কোনো ব্যাটসম্যান এগিয়ে গিয়ে একটু ‘ফাইন টিউন’ করার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ নিজেই অনুশীলন করতে করতে সহায়তা চাচ্ছেন এবং পাচ্ছেন। বোলারদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে থাকলো বারবার।
অনুশীলনে দেখা এই দৃশ্যগুলো যদি দলীয় বন্ধনের সত্যিকারের ইঙ্গিত দিয়ে থাকে, তাহলে আফগানিস্তানের প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। জয় আর অল্প ব্যবধানের পরাজয়ে বাংলাদেশের এই বন্ধনহীনতাটা আড়ালেই পড়ে যেতে বসেছিল। আফগানিস্তান যেন একটা ঘা দিয়ে আধমরাদের সত্যিই বাঁচিয়ে তুললো।
এখন অপেক্ষা, সত্যিই সবুজপ্রাণ হয়ে মাঠে নামার। কে জানে, তাহলেই হয়তো আজ পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৫ বছরের খরাটার অবসান হবে।
