দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশীয় আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সোমবার সকালে মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী নেপিততে পৌঁছেছেন। দুপুরে তিনি পার্লামেন্ট ভবনে মিয়ানমারের বিরোধী দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচি’র সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। সুচি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রায় আধঘন্টা বৈঠক করেন। অং সান সুচি শেখ হাসিনাকে দেখে জড়িয়ে ধরে স্বাগত জানান। শেখ হাসিনা তার পরিবারের সদস্য ও সফরসঙ্গীদের সুচির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে বৈঠক শেষে হাত ধরে শেখ হাসিনাকে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেন মিয়ানমারের নেত্রী সুচি।
আলোচনার মাধ্যমে শরণার্থী সমস্যা সমাধানের আহবান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বিকালে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে মিয়ান-মারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৌহাদ্যপূর্ণ আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন।
শাকিল বলেন, বৈঠকের শুরুতেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনে তাকে অভিনন্দন জানান মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট। আলোচনায় দুজনেই আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেন।
মিয়ানমারকে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী উল্লেখ করে শেখ হাসিনার আশা প্রকাশ করেছেন, দারিদ্র্য দূর করাসহ এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে সবাই এক সঙ্গে কাজ করবে। বাংলাদেশের মাটি কখনোই অন্য কোনো বন্ধু বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না বলেও থেইন সেইনকে আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অব্যাহত থাকবে। আন্তঃদেশীয় যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে এই অঞ্চলের দেশগুলো আরো শক্তিশালী হবে, বাণিজ্য বাড়বে। থেইন সেইন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, তার দেশ ভারত ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে সড়ক সংযোগের ব্যবস্থা করছে। বাংলাদেশ চাইলে এতে যোগ দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং চীনের কুনমিংয়ের মধ্যে সড়কপথ চালু হলে তা বাণিজ্য বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেরবে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের মিয়ানমারে বিনিয়োগে আগ্রহের কথাও দেশটির প্রেসিডেন্টকে জানান শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনার সঙ্গে ৪৫ মিনিটের বৈঠকে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সে দেশের মন্ত্রিসভার সদস্যরাও ছিলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ এম জিয়াউদ্দিন, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল ও মিয়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত অনুপ কুমার চাকমা।
শেখ হাসিনা বিকালে মিয়ানমারের পার্লামেন্ট পরিদর্শন করেন ও স্পিকার থুরা শোয়ে মান এর সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। এর আগে সকাল সোয়া দশটায় নেপিততে পৌঁছলে মিয়ানমারের শ্রম, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী আয়ে মিন এবং মিয়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত অনুপ কুমার চাকমা বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। সেখান থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে শেখ হাসিনাকে নিয়ে যাওয়া হয় রয়্যাল নেপিত হোটেলে।
এ সময় বিমানবন্দর থেকে হোটেলের পথে প্রায় ২৫ কিলোমিটার রাস্তায় দুই পাশে দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত স্কুল ছাত্র-ছাত্রীরা দুই হাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পতাকা নেড়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৮টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিত-এর উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আসম ফিরোজ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান শিকদার, তিন বাহিনী প্রধান, কূটনীতিকবৃন্দসহ বিভিন্ন বেসামরিক ও সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩২ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সফরসঙ্গীদের নিয়ে সফরের দুদিন তিনি রয়্যাল নেপিত হোটেলে থাকবেন।
আজ সকালে তিনি নেপিত-তে বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেকটরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। দুপুরে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সরকার প্রধানদের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন।
