ফারাক্কা আক্রান্ত পদ্মার বুকে ফসল ফলায় জেলেরা

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৪, ২২:৫০
পদ্মার সাথে মানুষের অন্তহীন সম্পর্ক। এই পদ্মারনদীতটে স্তন্যদায়িনী নদী-উদ্ভুত জীবন ও জীবিকাকে কেন্দ্র করেই বাঙালির বেঁচে থাকা। আর পদ্মাপাড়ের মানুষের কাছে নদী আরও কাছের, আরও নিকটের। পদ্মা মানুষকে ছেড়ে যেতে চাইলেও মানুষ পদ্মাকে ছাড়ে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মুমূর্ষু পদ্মা। কিন্তু জীবিকার তাগিদে মুমূর্ষু এই পদ্মার শেষটুকুও পান করতে ব্যস্ত নদীপাড়ের জেলেরা। বলছিলাম রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার জেলেদের কথা। গোদাগাড়ীর পদ্মাপাড়ের দু’ধারে অন্তত ৩০ হাজার জেলে পরিবারের বাস। শত শত বছর ধরে বাপ-দাদার পেশাটাকে আঁকড়ে আছেন তারা। কিন্তু পদ্মায় এখন পানি নেই। মাছ নেই। জেলেদের পেশাও নেই। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে অপমৃত্যু হয়েছে পদ্মা নামের এই নদীটির। বাধ্য হয়ে জেলেরা নৌকার বৈঠা আর জালের স্থানে হাতে তুলে নিয়েছেন কোদাল-কাস্তে আর লাঙল। গত আশ্বিনের শুরু থেকেই পদ্মায় পানি নেই। নদীর বুকে জেগে উঠেছে মাইলের পর মাইল বালুচর। কোথাও কোথাও আদর্শ পলিমাটির আস্তরণ। এই পলিমাটিই নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে জেলেদের। পলিমাটিতে ফলিয়েছেন সোনার ফসল। কোথাও ধান আবার কোথাও চৈতালি ফসলের সোনালী ঝিলিক। গোদাগাড়ী উপজেলার বিজয়নগর পদ্মাপাড় থেকে রেলগেট পদ্মাপাড় পর্যন্ত যতদূর দৃষ্টি যাবে পড়বে কৃষকের সোনার ফসল। এদের বেশিরভাগই পূর্বে পদ্মানদীর জেলে কিংবা মাঝি ছিলেন। এখন কৃষক। জীবিকার তাগিদেই পেশা পরিবর্তন করেছেন তারা। গড়ে তুলেছেন কয়েক’শ কৃষক সমবায়। এই কৃষক সমবায়ের মাধ্যমে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়েছেন কৃষক ও জেলেরা। পদ্মার হাজার হাজার হেক্টর গো-চারণভূমিকে চাষের আওতায় এনেছেন তারা। সমপ্রতি ঘুরে আসা হয় গোদাগাড়ীর পিরিজপুর এলাকায় পদ্মাগর্ভের একটি ফসলি মাঠ থেকে। ১০৭ জন কৃষকের সমন্বয়ে এই মাঠটি কৃষক সমবায়ের মাধ্যমেই গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে প্রায় ৩শ বিঘা জমিতে এবার চৈতালি ফসলের চাষাবাদ হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে, মসুর ডাল, খেসারি ডাল, সরিষা ইত্যাদি। এরপাশেই শতাধিক বিঘা জমিতে বোরো আবাদ শুরু হয়েছে। বোরোধানে সেচ দিতে জমির মাঝেই বসানো হয়েছে ৭টি শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নলকূপ। নলকূপের অপারেটর মাইনুল ইসলাম (৪২)। বাড়ি চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের পূর্ব কানাপাড়া গ্রামে। তিনি জানান, তিনি আগে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাঝি ছিলেন। কিন্তু পদ্মায় এখন নৌকা চলে না। তাই কৃষকদের পরামর্শে তার শ্যালো ইঞ্জিনটি দিয়ে গভীর নলকূপ বসিয়েছেন। বিনিময়ে অবশিষ্ট ১০৬ জন কৃষকের মতো তিনিও পাবেন ফসলের সমান ভাগ। তবে শ্যালো ইঞ্জিনের তেলের খরচ বহন করবেন সবাই। সেখেরপাড়া গ্রামের জেলে সখীচরণ (৪৫) জানান, আগে পদ্মায় মাছ ধরে জীবিকানির্বাহ করতেন। অন্যান্যে জেলের মতো তিনিও পদ্মায় চাষাবাদে মন দিয়েছেন। চাষাবাদ করেই কোনমতে তার সংসার চলে যাচ্ছে। এখন অপেক্ষা আগামী ভরা মৌসুমের। পদ্মায় পানি আসলে আবারো মাছ ধরায় মন দেবেন সখীচরণ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. এম সাইফুল আলম বললেন, ‘প্রতিবছর ভরা মৌসুমে পদ্মার মাটির পরিবর্তন হয়। কোন কোন স্থানে পলি ও দোঁয়াশ মাটির আস্তরণ পড়ে। এতে কোন সারের ব্যবহার ছাড়াই যে কোন ফসলই খুব ভাল উত্পাদন হয়ে থাকে।