উপকূল থেকে প্রায় ৬০০ মাইল দূরে এর অবস্থান। গ্যালাপ্যাগাস দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর দেশটির অন্তর্গত একটি প্রদেশ। ১৩টি বড়, ছোট ৬টি, এবং ৪২টি অতিক্ষুদ্র দ্বীপের সমন্বয়ে গ্যালাপ্যাগাস গঠিত। ধারণা করা হয়, আজ থেকে প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাতের ফলে দ্বীপটি প্রশান্ত মহাসাগরের বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়ায়। ১৫৩৫ সালে পানামার বিশপ ডিটমাস ডি বারলাঙ্গো দ্বীপগুলো আবিষ্কার করেন। ছোট বড় প্রায় ৬১টি রকমের দ্বীপের সমন্বয়ে এই ভূখন্ডটি গঠিত। এই দ্বীপে উল্লেখযোগ্য প্রাণির মধ্যে কচ্ছপই প্রধান। এক সময় এই দ্বীপে প্রায় আড়াই লাখ কচ্ছপ ঘুরে বেড়াত। অবশ্য আজ এদের সংখ্যা ১৫ হাজারে নেমে এসেছে।
গ্যালাপ্যাগাস শব্দ বা নামটি এসেছে কচ্ছপ থেকেই। কারণ স্পেনিশ ভাষায় বড় ধরনের কচ্ছপকে গ্যালাপ্যাগাস বলা হয়। এদের এক একটির ওজন প্রায় পাঁচশ’ পাউন্ড। দ্বীপটির মোট আয়তন ৩,০০০ বর্গমাইল। এই দ্বীপের ভূ-প্রকৃতি বড়ই অদ্ভুত প্রকৃতির। দ্বীপপুঞ্জের মাঝ বরাবর বিষুব রেখা চলে গেছে বলে নিতান্তই এর আবহাওয়া উষ্ণ হওয়ার কথা এবং সূর্যের কিরণ হবে অত্যন্ত প্রখর। কিন্তু তা মোটেও নয়, বেশ কয়েকটি প্রধান সমুদ্র স্রোতের মিলন কেন্দ্রে এই দ্বীপটি অবস্থিত হওয়ায় এবং বিভিন্ন স্রোতের মিলনে সাগরের নিচে তোলপাড় হয়ে সাগর তলের জলরাশি উপরে উঠে আসে এবং দ্বীপের আবহাওয়া ঠান্ডা রাখে।
সবচেয়ে আদিম প্রাণির মধ্যে কচ্ছপই প্রধান। বিশ্বের একমাত্র সামুদ্রিক ইগুয়ানা এখানেই পাওয়া যায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Amblyrhynchus cristatus। এরা শান্ত এবং তৃণ ভোজী। এখানকার জলরাশিতে আছে এক অদ্ভুত মাছ। ছোট আকারের মাছটি, বিচিত্র মুখ, বিচিত্র রঙ এর লাল টুকটুকে ঠোঁট। দেখতে অনেকটা শিং এর মতো। ইংরেজিতে বলা হয়ে থাকে Red nosed batfish. অন্যান্য বড় প্রাণির মধ্যে সীল, ডলফিন, হাঙ্গর, সিলায়ন এমনকি গভীর সাগরের স্পার্ম তিমিও আছে।
এখানে finch নামক একটি পাখি আছে। প্রায় ১৩ রকমের finch আছে এখানে। পাখিগুলো অনেক ছোট। এটি Vampire finch নামেও পরিচিত। এই জন্য যে পাখিটি বড় বড় পাখির পিঠ ঠকরাতে থাকে। এরকম করতে করতে যখন তার রক্ত বের হতো, তখন সে তা পান করে। এছাড়া ফ্লেমিংগো, মেকিংবার্ড, পেঙ্গইন, ব্লুহেরণ প্রভৃতি তো আছেই। ১৮৩৫ সালে প্রকৃতি বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন এই দ্বীপে এসেছিলেন এবং এখানকার নমুনাও তথ্যের উপর ভিত্তি করে ‘One the Origin of species by means of natural selection’ নামক এ গ্রন্থটি লিখেছেন। যা আমাদের চিন্তার জগতে অকল্পনীয় সাধন ঘটিয়েছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো। প্রাণিগুলো সবই গ্যালাপ্যাগাস দ্বীপের একান্ত নিজস্ব সম্পদ।
পৃথিবীর যত রকমের পাখি আছে তার প্রায় অর্ধেক এবং যত রকমের উদ্ভিদ আছে তার প্রায় অর্ধেক, যত রকমের কীটপতঙ্গ আছে তার প্রায় অর্ধেক, ৪৬ শতাংশ গ্যালাপ্যাগাস ব্যতীত আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এজন্যই প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা এ দ্বীপকে জীবন্ত চিড়িয়াখানা অথবা প্রাকৃতিক গবেষণাগার বলে আখ্যায়িত করেছেন।
