অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৪, ১৯:৩৮
যে যন্ত্রের সাহায্যে ক্ষুদ্র বস্তুকে অনেক গুণ বড় করে দেখা যায় তাকে অণুবীক্ষণ যন্ত্র বলে। গ্রীক শব্দ Micros-মানে ক্ষুদ্র এবং Skopeen মানে দেখা। এ দু’টি শব্দ হতেই নামকরণ করা হয়েছে Microscope. অর্থাত্ অণুবীক্ষণ যন্ত্র। স্কুল-কলেজের বিজ্ঞানাগারে শিক্ষার্থীদের হাতে প্রায় প্রতিদিনই নানা জিনিস অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিতে হাতে-কলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দেখা যায়। চিকিত্সাক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে আজকাল হাসপাতাল, ক্লিনিকে এ যন্ত্র ছাড়া রোগ নির্ণয় করার কথা চিন্তাই করা যায় না। নানা গবেষণা কাজেও এ যন্ত্রটি বহুলভাবে ব্যবহূত হচ্ছে। এ মহামূল্যবান যন্ত্রটির আবিষ্কারক হল্যান্ডের বিজ্ঞানী লিউয়েন হোয়েক। বিজ্ঞানের ইতিহাসে অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের জন্য এ বিজ্ঞানী চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে হ্যাল্ডের ডেলফট শহরে জন্মগ্রহণ করেন লিউয়েন হোয়েক। বাল্যকালে লেখাপড়া করে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেননি তিনি। ছোটকাল হতে তিনি যন্ত্রপাতির অনুকরণে নতুন কিছু তৈরি করার নেশায় মগ্ন থাকতেন। পরিণত বয়সে তিনি জীবিকা অর্জনের জন্য হল্যান্ডের ডেলফট শহরে একটি চশমার দোকান খুলেন। বেশ ভালই চলতে থাকে তার চশমার ব্যবসা। ক্রেতাদের মাঝে তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ক্রেতাদের তিনি নানা ধরনের চশমা তৈরি করে দিতেন। এতে করে ক্রেতাদের সাথে তার ভাল সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দোকানে বসে তিনি বিভিন্ন ধরনের কাঁচ ঘষে ঘষে লেন্স বানাতেন। তারপর সেই লেন্সকে নলের সাথে লাগিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। একসময় দেখা গেল তিনি ব্যবসায় মনোযোগ বাদ দিয়ে কাঁচ ঘষে ঘষে লেন্স বানাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। শেষে এমন অবস্থা হলো তার খামখেয়ালির ফলে চশমার ক্রেতারা তার দোকানে আর আসতেন না। নিউয়েন হোয়েক তাতে বেশ খুশি হয়ে ওঠেন। এ সুযোগে তিনি সারাদিন বসে লেন্সই বানাতেন। লেন্সের বৈশিষ্ট্য হলো ছোট জিনিসকে বড় করে দেখানো। শিশুদের মত তিনি গাছের পাতা, ঘাস, ছোট ছোট কীট-পতঙ্গ, চুল প্রভৃতি লেন্সের সাহায্যে দেখতেন। আর মজা করতেন। চিন্তা করে বের করলেন লেন্সকে হাত দিয়ে না ধরে রেখে তামার পাতের নল তৈরি করে তাতে লেন্স বসিয়ে দিলেন। অনেক সুবিধা হলো দেখতে। এরপর একটি লেন্সের পরিবর্তে দু’টি লেন্স স্থাপন করে পরীক্ষা চালিয়ে যেতে লাগলেন। অবশেষে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিউয়েন হোয়েক আবিষ্কার করলেন একটি যন্ত্র। যাতে খালি চোখে দেখা যায় না। সেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদার্থকে বড় করে সুন্দর দেখা গেল। তারপরই একদিন খেয়ালীপনা লিউয়েন হোয়েক পাশের বাগানের একটি টবের জমা থাকা পচা পানি এনে এ যন্ত্রের নিচে রেখে দেখলেন পানিতে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীব কিলবিল করছে। বেশ কয়েকবার এমন পরীক্ষা করলেন তিনি। একই অবস্থা দেখতে পেলেন। অবশেষে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে, পচা পানিতে বেশ কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীব বাস করে যা আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। আর ভালো পানিতে এদের পরিমাণ কম। কয়েকদিন পর তিনি আরেকটা পরীক্ষা করলেন। একটি পাত্রে পানি রেখে তাতে লঙ্কা ভিজিয়ে দিলেন। পাঁচ-ছয় দিন পর সেই পানির একফোঁটা এনে এ যন্ত্রে দেখলেন তাতে অনেক বেশি জীবাণু। হতবাক হলেন তিনি। নিজে সন্তুষ্টি হতে না পেরে যে অবস্থা অনেককে ডেকে এনে দেখালেন। অবশেষে তার পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে লিখে পাঠিয়ে দিলেন রয়েল সোসাইটিতে। সোসাইটির অনেক কর্মকর্তা তার বক্তব্য পড়ে লিউয়েন হোয়েককে পাগল বলে উড়িয়ে দিলেন। তার সাথে এ প্রতিষ্ঠানের দু’জন উত্সাহী সদস্য তার পরীক্ষাটি স্বচক্ষে দেখার জন্য তার দোকানে হাজির হলেন। নিউয়েন হোয়েক খুশি হয়ে তাদের এ পরীক্ষা দেখালেন। তারা বিস্মিত হলেন। তার হাতের তৈরি একটি যন্ত্র নিয়ে চলে গেলেন সোসাইটির সদস্যরা বুঝতে পারলেন যে, লিউয়েন হোয়েক একটি আশ্চর্য জিনিস আবিষ্কার করতে যাচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে তার নাম রয়েল সোসাইটির সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে দিলেন। বিজ্ঞানী হিসেবে লিউয়েন হোয়েকের নাম সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। আর এ যন্ত্রটির নাম দেয়া হল অণুবীক্ষণ যন্ত্র। লিউয়েন হোয়েকের গবেষণাগুলো বিজ্ঞানের ভান্ডারে এক একটি মণি-মুক্তা। তারই গবেষণা হতে মানুষ বুঝতে পারল এক ধরনের জীব যেমন পানিতে, মাটিতে, গাছের পাতাতে, মানুষের পাকস্থলিতে, দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে বাস করে যা মানুষ খালি চোখে দেখতে পায় না। এ মহাবিজ্ঞানীর তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে বিশ্বের অন্যান্য জীবাণু তত্ত্ববিদ্যা বা বিজ্ঞানীরা রোগজীবাণু আবিষ্কার করছেন এবং এদের ধ্বংসের উপায়ও বের করছেন। জগত্ বিখ্যাত এ বিজ্ঞানী ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর আবিষ্কারের জন্য পৃথিবীর মানুষের হূদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।