ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন। বই থেকে কেটে নিলাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরত্চন্দ্র এমনি অনেক লেখকের ছবি। পড়ার ঘরে টাঙ্গিয়ে দিলাম একের পর এক। কিন্তু ছবি দেখলে তো আর লেখক হওয়া যাবে না। অতপর, সাদা কাগজ দিয়ে ছোট একটা খাতা বানালাম। গল্পও লেখা হলো একটা। বড় চাচা বাড়ি গেছেন ছুটি কাটাতে। তার চোখে পড়ে যায় আমার গল্প। সুখকর ছিল না অভিজ্ঞতা। বললেন, সাধু ভাষা চলতি ভাষাটা বুঝে নিও। বর্তমান আর ভবিষ্যত্ কালটাও গুলিয়ে ফেলেছো। তবে থেমে যেও না। লিখতে থাকো।
১৯৬৭ সালের কথা। স্কুলে উপস্থিত বক্তৃতা করে পুরস্কার পেলাম মার্ক টোয়েনের সেরা গল্প। কিচ্ছু বুঝিনি মার্ক টোয়েন। কিন্তু গর্ব হলো বিদেশি লেখকের বই আছে আমার হাতে (আজও সেই বইটা রাখা আছে।) মার্ক টোয়েন না বুঝলেও এটুকু বোঝা গেছে, লিখতে হলে বিদেশি বইও পড়তে হবে। বিদেশি ভূতগুলোকেও যে চিনতে হবে। বিদেশি দাদী কিংবা নানাদের গল্পও জানতে হবে। অনুবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া সেই থেকে।
ক্লাস নাইনে পড়ি তখন। পুরোদস্তুর ছড়াকার হয়ে গেলাম মনে মনে। একের পর এক লিখতে থাকলাম। কিন্তু পাঠক কই। জমজ ভাই মোস্তফা হাসানকে দিলাম পড়তে। উত্তর পেলাম— ওহ! কবি একটা। বড় আপা কাজলের হাতে যেতেই খুব হাসলেন। ‘লেখ ভাই লেখ। সুন্দর হইছে’।
সেই লেখাই পাঠিয়ে দিলাম বাড়িতে আসা সমবায় নামের একটি ম্যাগাজিনে। খামোকাই অপেক্ষা করা। কয়েক মাসেও ছাপা হলো না। আরেকটি পাঠালাম পাক জমহুরিয়াত কিংবা পাক সমাচার নামের একটি ম্যাগাজিনে। সেটিরও গ্রাহক ছিলেন আব্বা। মাস কয়েক পর পাতা উল্টে দেখি আমার লেখা ছাপা হয়েছে ঢাকার পত্রিকায়। ছোট একটি ছড়া। ওহ! কী আনন্দ। চিত্কারে বাড়ি মাতিয়ে দিলাম। দাদী বললেন, দোয়া করি মশাররফ হোসেনের মতো বড় লেখক হও।
কিশোরদের যুদ্ধ করা, মা-বোনদের শহীদ হওয়া, রাজাকার আলবদরদের নৃশংসতার কথা জানার জন্য সুযোগ পেলেই গ্রামে যাই। সত্যি কথাগুলো তুলে ধরি, কোনো কোনো ঘটনা গল্পের মতো মনে হয়। সেগুলো নিয়ে গল্প লিখি। এমনি কিছু ঘটনা নিয়ে একটি বই ‘কিশোর যোদ্ধা কৈশোরের স্মৃতি’র জন্য এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেলাম। সেই সঙ্গে যুক্ত হলো কিশোর গল্প, উপন্যাস। অনুবাদের কাজও আছে বেশকিছু। সবমিলে বই প্রকাশিত হয়েছে ৪২টি। খুব ইচ্ছা আছে, মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু স্কুল নিয়ে একটি বই লেখার। শুরু করেছি কিছুদিন হলো। একটা স্কুলের কথাই বলি। ওখানকার ৩২ জন শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে আবার ৩ জনই বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছেন। যেমন তেমন কথা নাকি। আমার একটি বইয়ে স্থান পেয়েছে এমন একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি নাকি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালে যুদ্ধে গেছেন। বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের জন্য খেতাবও পেয়েছেন বীরপ্রতীক। আবু সালেক তাঁর নাম। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। (আবু সালেক বীরপ্রতীকের বাবাসহ প্রায় ৩০ জনকে জুম্মার নামাজ পড়তে গেলে মসজিদ থেকে বের করে নিয়ে একাত্তরের রাজাকাররা হত্যা করেছিল। ঘাতকদের একজন এখন বিচারাধীন) শিশু-কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধস্মৃতি নিয়ে কয়েকটি বই আছে আমার। অপ্রকাশিত আছে কয়েকটি। আজকের শিশু-কিশোররা গর্ব করতে পারে, এই দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে তাদের বয়সের মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই খেতাব পেয়েছেন। সেই গর্বের তালিকা করতে গিয়ে এই পর্যন্ত ২২ জনের নাম উদ্ধার করতে পেরেছি, যারা ওই সময় স্কুলে পড়তেন কিংবা যারা বয়সে ছিলেন একান্তই কিশোর। এমন বীর শিশুদের সম্মান না জানিয়ে কি পারা যায়? বিশ্বের সেরা বলেই এটা সম্ভব। সেই বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। সেই সুবাদেই আমার লেখায় মুক্তিযুদ্ধ বেশি থাকে।
