তৈরি পোশাক কারখানার পরিকাঠামো পরীক্ষণ প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৪, ২১:৪১
সমপ্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে, দেশের তৈরি পোশাক কারখানা ভবনের নিরাপত্তার মান নিরূপণের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি দিয়াছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। ইহার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এই কারণে ব্যাপক যে, এই সকল যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যেই বুয়েটের আওতায় থাকিলে দেশের পোশাক কারখানার পরিকাঠামো পরীক্ষার দায়িত্বটি বিদেশি ক্রেতাদের প্রতিষ্ঠান অ্যাকোর্ড বা অ্যালায়েন্স-এর গ্রহণ করিবার প্রয়োজন হইত না। মাত্র দুই সপ্তাহ পূর্বেই ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকোর্ড বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলি পরিদর্শনের দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে। রানা প্লাজার ধসের পর দেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের নিরাপত্তা লইয়া যখন সারা বিশ্বে সমালোচনার ঝড় উঠিয়াছিল, তখন পোশাক কারখানার অবকাঠামো ও শ্রমিক নিরাপত্তার দায়িত্ব বুয়েটকে দেওয়ায় আশ্বস্ত হইয়াছিল বিদেশি ক্রেতারা। কিন্তু এই কাজে বুয়েটেরও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। সব ধরনের কারখানার অবকাঠামোগত ভৌতিক অবস্থা নিরূপণের জন্য যেইসব মেশিনের দরকার ছিল, তাহা ছিল না বুয়েটের। এইবার আইএলও ও বিদেশি দাতারা এই সকল যন্ত্রপাতি দেওয়ার ফলে বুয়েটের দক্ষ জনশক্তি কাজে লাগাইবার পথটি উন্মুক্ত হইয়া গেল। ইহা আমাদের জন্য স্বস্তির বটে। কেননা, এই শিল্পখাতের সহিত সম্পৃক্ত ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত যে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থখাতে প্রবাহিত হয়, সেই মুদ্রাই একঅর্থে আবর্তিত হয় দেশের ব্যাংক-বীমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ-বন্দরসহ সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। তাহা ছাড়া দেশের পোশাক কারখানা দিন দিন বৃহত্ হইতে বৃহত্তর হইতেছে। বাড়িতেছে কারখানা ও শ্রমিকের সংখ্যা। কিন্তু তাহার অনুপাতে শ্রমিকের নিরাপত্তা সৃষ্টির কার্যকর ও যৌক্তিক কার্যক্রমের স্বল্পতা দেখা যায়। এই শিল্পের বিকাশের ও চাহিদার ধারা বলিয়া দিতেছে যে, আগামী দশ বত্সরে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ এখনকার প্রায় দ্বিগুণ হইবে। এই দিকে, কারখানার অবকাঠামো এবং উত্পাদনের পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি একে-অন্যের পরিপূরক। অথচ বিগত কয়েকটি বত্সর অভাবিত ও ভয়ঙ্কর সব দুর্ঘটনায় পতিত হইয়া দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এক ধরনের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করিয়াছে। অসংখ্য অঘটনের মধ্যে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড এবং রানা প্লাজা ভবন ধসের মতো দুর্ঘটনা এই শিল্পখাতের প্রবহমানতার ভিতরে বৃহত্ ঝঞ্ঝা ডাকিয়া আনিয়াছে। ইহা ছাড়াও বিগত বত্সর রাজনৈতিক অস্থিরতার হাত ধরিয়া সর্বক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতার দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। সেই সময় শ্রমিকদের মজুরি সংক্রান্ত জটিলতা, আকস্মিকভাবে যখন-তখন কারখানা ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ বা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ দেশের গার্মেন্ট রপ্তানি ক্ষেত্রটিকে ভয়াবহ এক খাদের দিকে লইয়া যাইতেছিল। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উপর ইহা যে নিদারুণ এক অভিঘাত ফেলিতে উদ্যত হইয়াছিল, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। এক্ষণে সেই অস্থিতিশীলতা প্রশমিত হইলেও গার্মেন্ট কারখানাসমূহের সাধারণ নিরাপত্তা, যাহার কারণে তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন কিংবা রানা প্লাজা ভবন ধসের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখোমুখি আমাদের হইতে হইয়াছে, সেই বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি দিয়া নিরীক্ষা করিবার বাস্তবতাও অধিকতর স্পষ্ট হইয়াছে। অতএব পোশাক কারখানা ভবনের নিরাপত্তা নিরূপণের যন্ত্রপাতি এক্ষণে বুয়েটের আওতায় আসায় পরোক্ষভাবে আমরাই আন্তর্জাতিকমানের পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতা অর্জন করিতে যাইতেছি। আগামীর কথা চিন্তা করিয়া এই শিল্পকে সুন্দরভাবে প্রবহমান রাখিতে এই খাতের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করিবার বিকল্প নাই। নচেত্ পোশাক খাতের প্রত্যাশিত উন্নয়ন অধরা থাকিয়া যাইবে। কেননা, বৃহত্ কিছু দুর্ঘটনার পর ইহা স্পষ্ট হইয়াছে যে, কারখানাসহ শ্রমিকদের নিরাপত্তায় অবহেলার ছাপ থাকিলে এই শিল্পখাতের স্থায়িত্ব সম্ভবপর হইবে না কোনোভাবেই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন