শেখ হাসিনা-মনমোহন বৈঠক

ত্রিপুরা থেকে অতিরিক্ত ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ পাবে বাংলাদেশ

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৪, ২২:৪৯
বাংলাদেশ ভারতের ত্রিপুরা থেকে অতিরিক্ত ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কিনতে পারবে। মিয়ানমারের নেপিতোতে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সাইউ লাইনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। গত ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মিয়ানমার আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে দুই প্রধানমন্ত্রী এই প্রথম সাক্ষাত্ করেন। শেখ হাসিনা ও ড. মনমোহন সিং-এর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে বাংলাদেশের বিদ্যুত্ খাতে ভারতের সহযোগিতা বাড়াতে অনুরোধ করেন। ‘বিশেষ করে ত্রিপুরা থেকে একশ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ বাংলাদেশের সঞ্চালন লাইনে যুক্ত করার জন্য মনমোহন সিংকে অনুরোধ জানান তিনি। মনমোহন সিং আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, সম্ভব দ্রুততম সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ নেয়া হবে।’ ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময় স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের কাছে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ বিক্রি করছে। এজন্য গত বছর দুই দেশের গ্রিড লাইনকে সমন্বিত করে প্রায় ৯৮ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন বসানো হয়। ভারত থেকে বাংলাদেশের গ্রিডে বিদ্যুত্ সঞ্চালনের জন্য ভারতের বহরমপুর ও বাংলাদেশের ভেড়ামারায় বসানো হয় দুটি সুইচিং স্টেশন। গত বছর ৫ অক্টোবর বিদ্যুত্ আমদানি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে দুই দেশের সরকার। এছাড়া ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার পালটানায় স্থপিত ৭০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুত্ প্রকল্প থেকে অন্তত একশ’ মেগাওয়াট বাংলাদেশে বিক্রির জন্য রাজ্য সরকার আগ্রহ দেখালেও নয়া দিল্লির সবুজ সংকেত না পাওয়ায় বিষয়টি আটকে আছে। পালটানায় ওই বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনে ভারতের পশ্চিম অংশ থেকে ভারি যন্ত্রপাতি পূর্ব অংশে নিয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশের ওপর দিয়েই। আশুগঞ্জে ট্রান্সশিপমেন্ট চালুর মধ্য দিয়ে ভারতকে সেই সুযোগ দেয় বাংলাদেশ। মাহবুবুল হক শাকিল বলেন, ‘বাংলাদেশকে সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী উল্লেখ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।’ শেখ হাসিনা বৈঠকে বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান- এই চার দেশ আঞ্চলিক উদ্যোগে জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান করতে পারে। এ উদ্যোগ এই অঞ্চলের অর্থনীতিকেও গতিশীল করবে।’ দুই দেশের স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে মাহবুবুল হক শাকিল বলেন, স্থলসীমা প্রটোকল ভারতের লোকসভায় উত্থাপন করায় মনমোহন সিংকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ওই প্রটোকল বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের বিল শিগগিরই ভারতের পার্লামেন্টে পাস হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। ‘তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ ভারতের ইতিবাচক ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে।’ শাকিল জানান, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সরকার প্রধানকে অভিনন্দন জানান। ‘দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টারও প্রশংসা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, টেকসই গণতন্ত্রের অব্যাহত ধারার চর্চার মাধ্যমে এই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হতে পারে।’ অন্যদের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশীদ, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শংকর মেনন ও পরাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ এম জিয়া উদ্দিন ও পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক। নিরাপদ ও স্থিতিশীল অঞ্চল গড়ার অঙ্গীকার পূরণের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমসটেকভুক্ত সদস্যদের প্রতি এই অঞ্চলের সকল মানুষের মর্যাদা ও শান্তি রক্ষায় একটি নিরাপদ স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধশালী এলাকা গড়ে তোলার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিমসটেকের ভ্রাতৃপ্রতীম সদস্যদের প্রতি আমি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধশালী অঞ্চল গঠনের মাধ্যমে নিজেদের জনগণের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের আহ্বান জানাচ্ছি।’ প্রধানমন্ত্রী সমন্বিত অর্থনীতি ও অভিন্ন সমৃদ্ধির স্বার্থে সম্মিলিত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে বিমসটেক সদস্য দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। তিনি আরো বলেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সমন্বিত অর্থনীতি ও অভিন্ন সমৃদ্ধির স্বার্থে আমাদের সম্মিলিত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে ঐক্যবদ্ধ শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে কাজ করতে হবে’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার সকালে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দে ্র তৃতীয় বিমসটেক (বে অব বেঙ্গল ইনিসিয়েটিভ ফর মাল্টি- সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনোমিক কো-অপারেশন) শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন। শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৮ সালে বিমসটেক গৃহীত সহযোগিতার ছয়টি ক্ষেত্র ১৪টি লক্ষ্যে সমপ্রসারিত হয়েছে। এর কয়েকটি ক্ষেত্রে অসাধারণ অগ্রগতি হয়েছে, অন্যগুলো নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিমসটেককে গতিশীল করতে প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বিশ্বাস এবং সুফলের ন্যায়সঙ্গত ও সুষম বন্টন’। শীর্ষ সম্মেলনে তৃতীয় বিমসটেক সম্মেলনের চেয়ারম্যান মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন স্বাগত ভাষণ দেন। অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকশে, নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী সেরিং তুবগে ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর পার্মানেন্ট সেক্রেটারী ও বিশেষ দূত সিহাসাক ফুয়ানকেটকেউ বক্তৃতা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে দুটি মেমোরেন্ডাম অব এসোসিয়েশন (এমওএ’স) এবং একটি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্টেন্ডিং (এমওইউ) বিমসটেক সদস্যভুক্ত রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয়। এগুলো হচ্ছে- ঢাকায় বিমসটেকের স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওএ’স), ভারতে আবহাওয়া ও জলবায়ু বিমসটেক সেন্টার প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং ভুটানে বিমসটেক কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ কমিশন ও বিমসটেক কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ অবজারভেটরী প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (বিসিআইও)। প্রধানমন্ত্রী বিমসটেককে দেয়া তার সরকারের সকল প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আমাদের সকলের লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিমসটেকের যে সম্ভাবনা রয়েছে তা কাজে লাগাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক দশক আগে বিমসটেক এফটিএ বিষয়ে সম্পাদিত কাঠামো চুক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে সহায়ক হয়। বাণিজ্য সমঝোতা কমিটির জন্য এই কাঠামো চুক্তির আওতায় এবং ২০১৪ সালের মধ্যে এর সব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্যাকেজ হিসেবে চারটি আন্তঃসম্পর্কিত চুক্তি করার প্রয়োজন দেখা দেয়। তিনি বলেন, এটি ঢাকায় অনুষ্ঠেয় পরবর্তী মন্ত্রী পর্যায়ের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বৈঠকে টিএনসি কার্যক্রমের অবসান ঘটাতে এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বৃহত্তর অংশ হিসেব শুল্ক বহির্ভূত বাধাসমূহ চিহ্নিতকরণসহ অর্থ ও বিনিয়োগের অবাধ প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হবে। শেখ হাসিনা টেকসই জ্বালানি উন্নয়নের উপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি আঞ্চলিক জ্বালানি গ্রিড ও জ্বালানি বাজার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। ‘আমাদের বিপুল পরিমাণ অব্যবহূত জ্বালানি রয়েছে’ উল্লে¬খ করে তিনি বলেন, বিশেষ করে জলবিদ্যুত্ উত্পাদনে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় প্রকল্প গ্রহণের বিরাট সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুত্ সরবরাহের অভিজ্ঞতা এ ব্যাপারে চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে পর্যবেক্ষণের জন্য বিমসটেক দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ ও অবস্থান নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে অভিন্ন নদ-নদীগুলোর পানি সম্পদ বন্টনে কার্যপ্রণালী প্রয়োজন। শেখ হাসিনা দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করে বলেন, বিমসটেকের স্থায়ী সচিবালয় আমাদের সকল চুক্তি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকে আরো ত্বরান্বিত করবে। বিমসটেকের কার্যালয় স্থাপনে ঢাকাকে নির্বাচন করায় প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এজন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি এই প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।