বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সবকার সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) দুই গ্রুপের ক্ষমতার অপব্যবহার ও দ্বন্দ্বে চিকিত্সকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ এবং দন্ত অনুষদের ডিন অধ্যাপক আলী আজগর মোড়লের অফিস কক্ষে হামলা-পাল্টা হামলা চালিয়ে ভাংচুর করেছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এই হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একটি গ্রুপকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে ওয়েলফেয়ার কমিটি গঠন নিয়ে স্বাচিপের দুই গ্রুপের মধ্যে ওই হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার দন্ত বিভাগের সর্বস্তরের চিকিত্সকরা কর্মবিরতি পালন করেন। ফলে ওই বিভাগে সকল ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকে। ওই বিভাগে আসা ৫ শতাধিক রোগী বিনা চিকিত্সায় বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন। হামলা ও ভাংচুরে জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তি প্রদান না করা পর্যন্ত দন্ত বিভাগের চিকিত্সকরা কর্মবিরতি অব্যাহত রাখবেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছেন। এদিকে এই হামলার প্রতিবাদে গতকাল মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির জরুরি বৈঠক হয়। সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. কণক কান্তি বড়ুয়ার সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. শরফুদ্দিন আহমেদসহ অন্য নেতৃবৃন্দ। সভায় আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সর্বস্তরের শিক্ষক ও চিকিত্সকরা আন্দোলনে যাবেন বলে আল্টিমেটাম দেয়া হয়।
অন্যদিকে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের নির্দেশে এই হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাত্ আজ বুধবার সকালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির সভাপতি ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মঈনুজ্জামান এবং দুই সদস্য শিশু বিভাগের (অনকোলজি) অধ্যাপক ডা. চৌধুরী ইয়াকুব জামান ও দন্ত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ওয়ারেস।
শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বলেন, ১১ বছর ধরে স্বাচিপের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্মেলন হয়নি। এক নেতার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে স্বাচিপের স্থানীয় কমিটি একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছে। গত পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন স্বাচিপের ওই নেতা। নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনে নিজের পছন্দের কর্মকর্তাকে বসিয়েছেন। ওই নেতার একক আধিপত্য বিস্তারের জন্যই বিশ্ববিদ্যালয় স্বাচিপ তিন গ্রুপে বিভক্ত। প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে ওই নেতা দোর্দণ্ড প্রতাপে চলেন। সর্বশেষ তার খায়েস হয়েছে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হবেন। এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যত দ্বন্দ্ব বলে নেতৃবৃন্দ জানান।
এ ব্যাপারে শিক্ষক সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. শরফুদ্দিন আহমেদ বলেন, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন করা হবে। মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হোস্টেলের প্রভোস্ট ও দন্ত অনুষদের ডিন ডা. আলি আজগর মোড়ল বলেন, স্বাচিপের দুই গ্রুপের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে হোস্টেলের ওয়েলফেয়ার কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে এক গ্রুপের লোকসংখ্যা কম হওয়ায় এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীমউদ্দীন হল ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতাও বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন। ওই নেতা বলেন, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাচিপের এক নেতার কথায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়েছেন।
স্বাচিপের এক গ্রুপের নেতৃত্ব প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির মহাসচিব ডা. জাকারিয়া স্বপন বলেন, স্বাচিপের ডা. আজিজ গ্রুপের ৬ জনকে ওয়েলফেয়ার কমিটিতে রাখা হয়েছে। কিন্তু এটা তারা মানতে রাজি নন। অথচ আলোচনা করেই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। হামলাকারীদের সঙ্গে বহিরাগতরা ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে স্বাচিপের অন্য গ্রুপের নেতা ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. এম এ আজিজ বলেন, তার কোন গ্রুপ নেই। তিনি সব কিছু থেকে বঞ্চিত। ১১ বছর যাবত্ স্বাচিপ এক নেতার নির্দেশনায় চলে। ওই নেতাই স্বাস্থ্য সার্ভিসের সকল অপকর্মের হোতা বলে তিনি দাবি করেন। এ ব্যাপারে জানতে স্বাচিপের কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলানকে কয়েক দফা ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।
