ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপের চেষ্টায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশের সংগঠন জি-৮ থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কারের চেষ্টায় তত্পর যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য সদস্য দেশ। একই কারণে রুশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সামরিক মহড়াসহ সব ধরনের কর্মকাণ্ড স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে পেন্টাগন। কেবল বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানরাই নন, বিভিন্ন গণমাধ্যমের মন্তব্য প্রতিবেদনেও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। পুতিনের এই যুদ্ধংদেহী আচরণের নিন্দা জানিয়েছেন তারা। তারা বলছেন, চড়া মূল্যে যদিও রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে তাহলেও রাশিয়ার জন্য খুব লাভজনক হবে না ।
ভারতের জনপ্রিয় দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা রাশিয়ার সম্পদ জব্দ, বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত ও রুশ কর্মকর্তাদের ভিসার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র আগেই হুঁশিয়ার করেছে, ইউক্রেনে সেনা পাঠানো হলে মস্কোকে চড়া মাশুল দিতে হবে। গত রবিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, ইউক্রেনে রুশদের সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রাখলে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য জি-৮ সম্মেলনে যাবে না যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি সংস্থাটি থেকে মস্কোকে বহিষ্কারও করা হতে পারে। জন কেরি ক্রিমিয়াতে রাশিয়ার সামরিক সমাবেশ ঘটানোকে একটি অবিশ্বাস্য আগ্রাসী আচরণ বলে বর্ণনা করেছেন।
রাশিয়ার ওপর চাপ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কূটনৈতিক তত্পরতা আরো বাড়িয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রন্ত্রী উইলিয়াম হেগ কিয়েভে গেছেন। তিনি বলেছেন ইউক্রেনের সঙ্কট একবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় সঙ্কট হয়ে দেখা দিয়েছে। ইউরোপের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বিষয়ক সংস্থা ওএসসিই ভিয়েনায় ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠক করছে। সংস্থার বর্তমান প্রধান সুইটজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইউক্রেন নিয়ে তিনি একটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ গোষ্ঠী গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএন’র এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বিশিষ্ট কলাম লেখক ফরিদ জাকারিয়া লিখেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের ক্রিমিয়া ইস্যুতে যা করছেন তা ভুল। তিনি ভ্রমগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি হয়তো মনে করছেন তার এই আচরণে পশ্চিমা বিশ্ব জোটবদ্ধ হবে এবং একই ভূমিকা পালন করবে। তারপরই বোঝা যাবে কে ভাল আর কে মন্দ। তার ভাবনাটা সঠিক। কিন্তু তার কাছে এটাই আশ্চর্যের বিষয় যে তার মতো ইউরোপীয় ইউনিয়ন তথা পশ্চিমা বিশ্ব আচরণ করছে না। জর্জিয়ার মতো ক্রিমিয়ার ক্ষেত্রেও পশ্চিমা শক্তি উস্কানিমূলক আচরণ করছে না। তারা বরং সমঝোতার চেষ্টা করছেন। তবে মূল কথা হলো, ইউক্রেনের অধিকাংশ জনগন পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চায়। একবিংশ শতাব্দীতে তারা আধুনিক যুগে প্রবেশ করতে চায়। ফরিদ জাকারিয়া বলেন, চীন কিংবা অন্য দেশ যদি রাশিয়ার মতো আচরণ করতো তাহলে আমরা কী করতাম? তার মতে, হয়তে ইউক্রেন একটু বিপদে আছে তবে দেশটি বিভক্ত হচ্ছে না। ক্রিমিয়ার জনগন রাশিয়া না ইউক্রেনের পক্ষে থাকতে চান সেজন্য তিনি একটি গণভোটের পক্ষে মত দেন।
একই পত্রিকায় লিখেছেন লিওন অ্যারোন নামের এক লেখক। তার মতে, ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার উদ্দেশ্য বুঝতে হলে তিনটি বিষয়কে বিবেচনা করতে হবে। তা হলো রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি, রাশিয়া একটি পরমাণু শক্তিধর দেশ এবং দেশটি সুপার পাওয়ারের একটি দেশ। রাশিয়ার সরকারের অবস্থান বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হতে পারে। তবে পুতিন তার পূর্বসূরীদের চেয়ে ঝুঁকি নিচ্ছেন। পুতিন নেপোলিয়ান বোনাপার্টের নীতি গ্রহন করেছেন। নেপোলিয়ানের নীতি ছিল, প্রথমে যুদ্ধ শুরু করো, তারপর সিদ্ধান্ত নাও কি করতে হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি খ্যাত দৈনিক দ্য ডেইলি বিস্ট পত্রিকায় লেখা মন্তব্য প্রতিবেদনে ডেভিড স্যাটারের মতে, পুতিন ইউক্রেনে সৈন্য পাঠিয়েছেন কেবল বিদেশে তার দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্যই নয়, দেশে নিজের শাসনামলকে শক্তিশালী করা তথা নিজেকে রক্ষার জন্য। কারণ পুতিনের সঙ্গে ইউক্রেনের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের মিল রয়েছে। তারা দুজনই নিজ দেশে একই ধরনের সরকার গঠন করেছেন। অপরাধের মাধ্যমে তারা দেশে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন। এজন্য ইয়ানুকোভিচের ভাগ্য পুতিনকেও বরণ করতে হতে পারে। আর এজন্য পুতিন চায় যে মূল্যে ইউক্রেনে অভ্যুত্থান বন্ধ করা।
মস্কো’স শ্যাডোউজে লিখেছেন বিশিষ্ট কলাম লেখক মার্ক গ্যালিওতি। তার মতে, রাশিয়া যদি ক্রিমিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তাহলে তাকে চড়া মূল্য দিতে হবে। তারপরও যে সেটা রাশিয়ার স্বার্থের জন্য লাভজনক হবে সেটা কিন্তু নয়। কারণ ক্রিমিয়া অর্থনৈতিকভাবে ততোটা শক্তিশালী নয়। ইউক্রেন সরকার এখানে ভর্তুক দেয়।
বেন জুদাহ পলিটিকো ম্যাগাজিনে লিখেছেন, রাশিয়া ইউরোপীয়ান তথা পশ্চিমা বিশ্বকে ভয় পায় না। কারণ পশ্চিমা বিশ্ব পরিচালিত হয় অভিজাতদের দ্বারা। পুতিন মনে করছেন, এসব অভিজাতরা তার বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং অর্থ আয়ের চিন্তা করবে। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসের কথাই ধরা যাক। পুতিনের বিশ্বাস, ব্রাসেলস মানবাধিকারের কথা বলে। কিন্তু কখনো সেটা বিশ্বাস করে না। আর তাই পুতিন মনে করেন, তিনি কোনো ধরনের ঝুঁকি ব্যতিরেকেই ক্রিমিয়া আক্রমণ করতে পারবেন।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের স্কট উইলসনের মতে, ইউক্রেনের সংকটাপন্ন পরিস্থিতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি পরীক্ষা। তিনি তার জনগনের কাছে এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে সরে আসছে। এমনকি বিদেশের রাষ্ট্রনেতাদেরও তিনি একই বার্তা দিয়েছেন। আর এটা রাশিয়াকে একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। তাই এখন অপেক্ষায় থাকতে হবে ওবামা কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে সমস্যার একটা ফলপ্রসূ সমাধানে পৌছাতে পারেন।
