পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০১৪, ২০:৫৮
পুলিশ সপ্তাহ চলিতেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবার রাজারবাগ পুলিশ লাইন মাঠে ইহার উদ্বোধন করিয়াছেন। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলিয়াছেন যে পুলিশ বাহিনীর উন্নয়নে তাঁহার সরকার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করিতেছে। আইন-শৃঙ্খলা খাতে এই অর্থবরাদ্দকে সরকার বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচনা করে বলিয়াও তিনি মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের সহিত দ্বিমত প্রকাশের কোনো অবকাশ নাই। সর্বপ্রকার উন্নয়ন ও অগ্রগতির পূর্বশর্ত হইল শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা। আর এই ক্ষেত্রে—বিশেষ করিয়া জনগণের জানমালের নিরাপত্তাবিধানে— পুলিশ বাহিনীর ভূমিকাই যে মুখ্য তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না। গণতন্ত্রঅভিমুখী রাজনৈতিকভাবে অস্থির উন্নয়নশীল দেশগুলিতে কাজটি যে কতোখানি কঠিন—তাহা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। একদিকে জনবল, দক্ষতা ও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখিবার ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিতে গিয়া প্রায়শ বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হইতে হয় তাহাদিগকে। বাংলাদেশের বাস্তবতাও ভিন্ন নহে। তবে স্বস্তির বিষয় হইল, নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের পুলিশ বাহিনীর প্রশংসার পাল্লাই নিঃসন্দেহে ভারী। পাশাপাশি ইহাও স্মর্তব্য যে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ পুলিশের অর্জন ও ঐতিহ্য গর্ব করিবার মতো। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে স্বাধীনতাকামী জনগণের সহিত একাত্ম হইয়া পুলিশই প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিয়াছিল হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। শুধু তাহাই নহে, পুলিশের সহস্রাধিক কর্মকর্তা আত্মোত্সর্গ করিয়াছিলেন স্বাধীনতার বেদিমূলে। ইহার পর গত চার দশকে পুলিশ শুধু সংখ্যাগতভাবেই বাড়ে নাই, একই সাথে বৃদ্ধি পাইয়াছে তাহাদের বহুমাত্রিক সক্ষমতাও। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে তাহাদের তত্পরতা ক্রমেই দৃশ্যমান হইয়া উঠিতেছে। বিশেষ করিয়া উগ্রবাদী তত্পরতা এবং সাইবার ক্রাইমের মতো নিত্যনূতন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও তাহারা দক্ষতার স্বাক্ষর রাখিয়া চলিয়াছেন। পুলিশের এই সাফল্যের আভা ইতিমধ্যে দেশের সীমানা অতিক্রম করিয়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ছড়াইয়া পড়িয়াছে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে তাহাদের কদর বাড়িয়া চলিয়াছে। তবে মুদ্রার অন্যপিঠটিও একেবারে অগ্রাহ্য করিবার মতো নহে। পুলিশের বিরুদ্ধে নানা সমালোচনাও শোনা যায় হরহামেশাই। সর্বাপেক্ষা বড়ো সমালোচনাটি হইল হয়রানির। সেই সাথে আছে দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম, অদক্ষতা এবং আইনের সীমালঙ্ঘনের গুরুতর কিছু অভিযোগও। এইগুলি যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে অভিযোগগুলি একেবারে উপেক্ষা করিবার মতো নহে। কারণ গুটিকয়েক সদস্যের নীতিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের জন্য বিশাল একটি বাহিনীর ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হউক—ইহা কাহারও কাম্য হইতে পারে না। পুলিশের নানা সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টি নীতিনির্ধারক মহলের অজানা নহে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়া বাড়িয়া চলিয়াছে অপরাধের সংখ্যাও। তাহার সাথে যুক্ত হইতেছে নূতন নূতন মাত্রা। ছাত্র ও শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রভাবশালী মহলের অভিপ্রেত হস্তক্ষেপ প্রায়শ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করিয়া তুলিতেছে। সেই তুলনায় পুলিশের জনবল, সরঞ্জাম, দক্ষতা ও পেশাদারির ঘাটতির বিষয়টি সুবিদিত। সমস্যা সমাধানে সরকার যে যথাসাধ্য চেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে—প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও তাহার সুস্পষ্ট আভাস রহিয়াছে। ইতিমধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপও গৃহীত হইয়াছে। তবে একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী পুলিশ বাহিনী গড়িয়া তুলিতে হইলে শুধু জনবল, সরঞ্জাম ও বেতনভাতা বৃদ্ধিই যথেষ্ট নহে। সমভাবে নজর দিতে হইবে দক্ষতা, নীতিনৈতিকতা ও পেশাদারি মান উন্নয়নের প্রতিও। মনে রাখিতে হইবে যে যতো সমালোচনা কিংবা সীমাবদ্ধতাই থাকুক, বিপদে-আপদে জনগণ পুলিশের নিকটই ছুটিয়া যায়। পুলিশই তাহাদের শেষ ভরসাস্থল।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন