সফেদ পাজামা পাঞ্জাবি আর হাতকাটা কালো কোট পরে দৃঢ়তার সাথে হেঁটে এসে মঞ্চে উঠলেন দীর্ঘদেহী এক বাঙালি। সাথে করে তিনি নিয়ে এলেন সাড়ে সাতকোটি বাঙালির ভবিষ্যত্, আত্মসম্মান ও অধিকার আদায়ের মন্ত্র। পুরো জাতি তার বজ নির্ঘোষ সেই উচ্চারণ শোনার প্রতীক্ষায় উদগ্রীব। সেই ভাষণ শুনতে ঢাকার প্রতিটি বাড়ির প্রতিটি ছেলে এসে উপস্থিত রেসকোর্স ময়দানে। কোন ছেলে ঘরে বসে ছিল না। শুধু ঢাকা নয় সারাদেশের মানুষ উন্মুখ হয়ে বসেছিল সেই ভাষণের প্রতীক্ষায়। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের সেই ভাষণ শুধু বাংলার নয় পৃথিবীজুড়ে মানবমুক্তির আন্দোলনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী উদাহরণ। আর বঙ্গবন্ধু মানুষের সেই মুক্তির আন্দোলনের পথে চিরপ্রেরণার প্রতীক। বাঙালির অবিসংবাদিত এই নেতা ৭ই মার্চের ভাষণে কী বলেছিলেন, সেই ভাষণের দিক-নির্দেশনায় বাঙালি জাতি যে মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল- তা আজ কারো অজানা নয়। কিন্তু সেদিন এই ভাষণের আগে তার প্রস্তুতি কি ছিল। কেমন কাটছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনকের মুহূর্তগুলো?
বঙ্গবন্ধুর রুদ্ধদ্বার বৈঠক
সেদিন সকাল থেকেই ৩২ নম্বরে ছিল নেতা-কর্মীদের উপচেপড়া ভিড়। এদিকে, বঙ্গবন্ধু লাইব্রেরী রুমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। দীর্ঘ বৈঠক শেষে বেরিয়ে ঢুকলেন বসার ঘরে। অপেক্ষমাণ নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বললেন, তারা ঐক্যমতে পৌঁছেছেন এবং বিকালে রেসকোর্সের সভায় দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে চার দফার ঘোষণা দেয়া হবে। এরপর সবাই যে যার বাড়িতে চলে যান। দুপুরের খাবার শেষে বঙ্গবন্ধু যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তখন ড. কামাল হোসেন ঘোষণাপত্রের খসড়া দেখিয়ে নিয়ে যান। এসময় বঙ্গবন্ধু এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে নির্দেশ দেন তিনি যেন মূল কপির সঙ্গে টাইপ করা কপিটি মিলিয়ে দেখেন।
কী ছিল ঘোষণা পত্রে
‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, যার যা আছে তা নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়’- বঙ্গবন্ধু ৭ ই মার্চের ভাষণে মন্ত্রের মত সেইসব উচ্চারণ আজো এদেশের প্রতিটি মানুষকে উদ্বেলিত করে। যে কোন আন্দোলনে তার সেই জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রেরণা জোগায়। অথচ সেদিন যখন ভাষণের ঘোষণাপত্র তৈরি হচ্ছিল, সেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের এসব কথার কোন ছাপই ছিল না। ঘোষণাপত্র প্রসঙ্গের বিস্তারিত উঠে এসেছে এম এ ওয়াজেদ আলীর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে। সেদিন ৭ই মার্চে ঘোষণাপত্রের চূড়ান্ত কপিটি মিলিয়ে দেখার এক পর্যায়ে তিনি খন্দকার মোশতাককে জিজ্ঞেস করেন যে, ‘ইশতেহারে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে কিনা।’ তিনি বলেন যে, ‘সামরিক শাসনের ক্ষমতাবলে জারিকৃত আইনগত কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ঢাকায় বসে পাকিস্তানের অখণ্ডতা লঙ্ঘন সংক্রান্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার ব্যাপারটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং, এই ব্যাপারটা ইশতেহারে লেখা হয়নি।’
সেদিনের ইশতেহারে ইয়াহিয়া খানের নিকট দাবি করা হয়ঃ ১. সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। ২. পহেলা মার্চ থেকে আন্দোলনে যে সমস্ত ভাইবোনকে হত্যা করা হয়েছে, সে বিষয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশন গঠনের মাধ্যমে তদন্ত করে সে ব্যাপারে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। ৩. সামরিক আইন অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। ৪. অবিলম্বে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দলের নেতার কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
রেসকোর্সের পথে
রেসকোর্সে রওয়ানা হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু কয়েকজন নেতা-কর্মীকে ডেকে বলেন, ‘ইশতেহারটি সাংবাদিকদের মাঝে বিলি করবে।’ এই বলে তিনি একটি ট্রাকে উঠে যাত্রা করেন। এসময় সেই ট্রাকে ছিলেন সিটি আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজী গোলাম মোস্তফা, শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, সিরাজুল আলম খান প্রমুখ। এছাড়া মোস্তফা মহসীন মন্টু, কামরুল আলম খসরু, মহিউদ্দিন, আ স ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজসহ অন্যান্য নেতা-কর্মী অন্য একটি ট্রাকে ছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সমপ্রচার হঠাত্ করে বন্ধ
সেদিন রেসকোর্সে নৌকা আকৃতির সভামঞ্চটি স্থাপন করা হয়েছিল বর্তমান শিশুপার্কের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে। বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে যাবার পর একটি গাড়িতে শেখ হাসিনাসহ অন্যদের নিয়ে যাত্রা করেন ওয়াজেদ মিয়া। মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছে শেখ হাসিনা রেডিও অন করতে বলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচারের কথা এসময় রেডিওতে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছিল। কিন্তু ভাষণ শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রেডিও নিস্তব্ধ। সম্প্রচারের অনুমতি থাকলেও সরকারের তাত্ক্ষণিক নির্দেশে ভাষণ সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। সেদিন রাতে ইকবাল বাহার চৌধুরীর নেতৃত্বে রেডিও পাকিস্তান কেন্দে র সকল কর্মকর্তা ৩২ নম্বরের বাসায় এসে বঙ্গবন্ধুকে জানান যে, এ ভাষণ সম্প্রচার করতে না দেয়া পর্যন্ত তারা কাজে যোগ দেবেন না। এদিন রেডিও পাকিস্তানের সকল অনুষ্ঠান বন্ধ ছিল। ৮ মার্চ সকাল ৮টায় পাকিস্তান রেডিও ঢাকা কেন্দ থেকে ঘোষণা করা হয় যে, ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ভাষণ হুবহু সকাল ৯টায় প্রচার করা হবে।
বঙ্গবন্ধু বললেন, আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন দুইবেলা আমার সঙ্গে খাবে
৭ই মার্চের রাত বঙ্গবন্ধুর বাসভবন। পুরো পরিবার নিয়ে খেতে বসেছেন বঙ্গবন্ধু। এসময় বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ হাসিনা, ওয়াজেদ মিয়া, শেখ কামাল, শেখ জামাল, রেহানা, রাসেল, শেখ শহীদ উপস্থিত ছিলেন। তিনি এসময় গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘আমার যা বলার ছিল আজকের জনসভায় তা বলে দিয়েছি। সরকার এখন আমাকে যে কোন মুহূর্তে গ্রেফতার করতে পারে। সেজন্য আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন দুইবেলা আমার সঙ্গে খাবে।’ সেদিন থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন পুরো পরিবার তার সঙ্গে খেয়েছেন।
