আজ নারী দিবস। বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার রক্ষার দাবি নিয়ে ১৯১০ সালে এই দিনে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে জার্মান নেত্রী ৮ মার্চকে বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। সে থেকে পালিত হয়ে আসছে নারী দিবস। এই বছর ‘ইনস্পায়ার চেঞ্জ’ অর্থাত্ পরির্বতনে উত্সাহিত করাকে প্রতিপাদ্য করে পালিত হবে দিনটি। বাংলাদেশ সরকার দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে—‘অগ্রগতির মূল কথা নারী-পুরুষের সমতা’। আর বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ‘রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করি নারীর সমতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করি’-কে প্রতিপাদ্য করে পালন করবে দিনটি। প্রতিপাদ্য যাই হোক আমরা চাই নারীর সমতা-উন্নয়ন সর্বস্তরে অর্জিত হোক। আমাদের সকল পাঠককে জানাই নারী
দিবসের শুভেচ্ছা।
নিজেদের দক্ষতা আর প্রজ্ঞা নিয়ে নারী আজ যেকোনো চ্যালেঞ্জিং পেশায় নিজের জায়গা করে নিচ্ছে পুরুষের সঙ্গে সমান তালে, কোথাও তাদের চেয়ে একটু এগিয়ে আছে নারী। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে দেড় লক্ষ পুলিশ আছে। এদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৬ হাজারের অধিক। একটা সময় ভাবা হতো এ কাজ নারীর নয়। কিন্তু আজ বেশ কিছু সংখ্যক নারী শীর্ষ স্থানীয় পুলিশের কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনসহ পুলিশের প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন। তাদের কয়েকজনকে নিয়ে নারী দিবসের এই প্রতিবেদন লিখেছেন বারেক কায়সার
মুক্তা ধর
সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ
নারী নাকি যেখানেই যায় বিপদ তার পিছে রয়। না, এই ধারণা ঠিক নয়। অনেক সময় এমন নারী আছেন যাদের দেখলে বিপদ উল্টো পালায়। এমনই একজন মুক্তা ধর। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার তিনি। কথা হয়েছে এই পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে। তিনি জানালেন, দেশে নারীদের অগ্রযাত্রা শুরু হয়ে গেছে। সব সেক্টরেই নারীর সমান পদচারণা। এটা আশার কথা। কোনো সেক্টরেই নারীরা পিছিয়ে নেই। এবার তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করবে। পুলিশেও নারীদের সমান পদচারণা লক্ষ করা যাচ্ছে। অফিসার হিসেবে ভালো করছে নারীরা। তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস, শুধু পুলিশ হিসেবে নয়, কর্মজীবী সব নারীই সদাজাগ্রত ও নিপুণ; কর্মস্থল ও সংসার দুই ক্ষেত্রেই। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তিনজনের পরিবার মুক্তা ধরের। চাকরির পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে আনন্দে হেসে-খেলেই জীবন কাটছে। এই পুলিশ অফিসারের মনে করেন, নারীদের মধ্যে আছে শক্তি ও যোগ্যতা, শুধু প্রয়োজন সেই শক্তিকে চিনে নেওয়া। চাকরি ও পরিবার দুইয়ের মাঝে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে নারীদের।
আমি যে পেশায় আছি সেখানে পরিবার-পরিজন থেকে দেশ ও দেশের মানুষের প্রতিই বেশি দায়িত্বশীল হতে হয়। সবাই যখন ছুটি কাটায়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়, আমাদের তখনও দেশের মানুষের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থেকে কাজ করতে হয়। তবে এতেই আমি সুখ খুঁজে নিচ্ছি। সবার তো এমন ভাগ্য হয় না। দেশের সেবা করার সুযোগ সবাই পায় না। আর সবার মধ্যেই তো আমার পরিবার বাস করে। মেয়েদের সচেতনতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় আমাদের কাছে খবর আসে মেয়েদের আত্মহত্যার পেছনে বখাটে ছেলেদের উত্ত্যক্তকরণই দায়ী। এমনটা ঘটলে অবশ্যই পুলিশকে অবহিত করতে হবে। তদন্ত করার পর আত্মহত্যায় প্ররোচণা দানে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান আছে। তিনি জানান, নারী নির্যাতন রোধে নারী পুলিশের পরিচালনায় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার আছে।
শামীমা বেগম
উপ-পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই প্রত্যাশা ছিল পুলিশ হবো। আমার মনে হয়েছিল পুলিশের পেশাটাই চ্যালেঞ্জিং। অন্য পেশা থেকে আলাদা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করেছি। ২০০০ সালে যোগ দিই রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশে। প্রায় ১৫ বছর হলো চাকরির বয়স। স্বামী মো. মনির হোসেন নড়াইলের এএসপি। তিনি আমাকে বুঝেন। আমিও তাকে বুঝি। আমাদের বোঝাপড়া ভালো। পরিবারের পক্ষ থেকে সহায়তা পাচ্ছি সবসময়। সকালে হরতালের ডিউটি করতে গেলে শাশুড়ি উঠে চা বানিয়ে দিত। তিনি জানান, আমার দুই বছরের একটি মেয়ে আছে। আমি জায়েদের সঙ্গে যৌথ পরিবারে থাকি। জায়েরা আমাকে অনেক সহায়তা করে। একজন মেয়ের সফলতার পেছনে পরিবারের সহায়তা বিশেষ প্রয়োজন। সেই হিসেবে আমি ভাগ্যবতী। আমার মনে হয় প্রত্যেক মেয়ের স্বাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন। কারও উপর নির্ভর না করেও আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচা যায়। আমাদের দেশে আজও মেয়েরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। তবে সময় বদলাচ্ছে।
রহিমা আক্তার লাকি
সহকারী পুলিশ কমিশনার, গুলশান ট্রাফিক জোন
অনার্সে পড়ার সময় পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন দেখি। এটি ভিন্ন রকম এক পেশা, যেখানে সরাসরি মানুষকে সেবা করার যেমন সুযোগ আছে, তেমন আছে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ। আমার পরিবার এমন একটি চ্যালেঞ্জিং পেশায় আমাকে আসতে দারুণভাবে উত্সাহিত করেছে। বিয়ের পরে স্বামী এবং শ্বশুর বাড়ির লোকজনেরও সমান সহযোগিতা পাই। আমি মনে করি পুলিশ বাহিনীতে মেয়েদের কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। এখানে মেয়েদের কাজের মূল্যায়ন হয়। এখন পুলিশে মেয়েরা অনেক ভালো কাজ করছে। কোনো কোনো জায়গায় তারা পুরুষের চাইতেও ভালো কাজ করছে। তা ছাড়া আমার মনে হয় মেয়েদের আলাদা কোনো পেশা নেই। মেয়েরা যেকোনো পেশায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে। সকল ক্ষেত্রে মেয়েদের যোগ্য হয়ে এগিয়ে আসার সময় হয়েছে। কোনো মেয়ে যদি নিজের অসচেতনতার জন্য নির্যাতনের শিকার হয় তা মেনে নেওয়া আমার জন্য কষ্টকর হয়ে যায়। মনে হয়, একটু সচেতন হলেই তার জীবনটা এমন হতো না।
