লক্ষ্য যাদের আকাশ ছোঁয়ার

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৪, ১৯:১৬
হেঁটে হেঁটে আকাশ ছোঁয়া! আরে ভাই হেঁটে হেঁটে আকাশ ছোঁয়া যায় নাকি? সাধারণভাবে এই প্রশ্নের উত্তরে ‘না’-ই বলবেন সবাই। তবে ইফফাত ফারহানা তান্নিকে যখন এই প্রশ্ন করা হলো বিস্ময়করভাবে উত্তরটা এল, ‘হ্যাঁ যায়।’ ফোনালাপের শুরুতেই অনেকটা বোকা বনে যাওয়া এই প্রতিবেদকের পরবর্তী প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ছিল কীভাবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এই শিক্ষার্থী হেসে উত্তর দিলেন, ‘সহজ, আপনি যদি হেঁটে হেঁটে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে পারেন, তাহলে আকাশ ছোঁয়ার আর বাকি রইল কী?’ উত্তর শোনার পরক্ষণেই মনে হলো, আরে সত্যিই তো। হ্যাঁ, নিশাত মজুমদার-ওয়াসফিয়া নাজনীনদের দেখানো পথে হাঁটতে সংকল্পবদ্ধ তান্নি। অক্সিজেন স্বল্পতার আশঙ্কা আর উচ্চতা ভীতিকে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়ে মর্ত্যলোকের সর্বোচ্চ উচ্চতাকে পদদলিত করার স্বপ্নে বিভোর কেবল তান্নি নন। এ দুর্গম পথে তার সাথে আছেন সাদিয়া চৌধুরী, আইরিন পারভীন ডায়ানার মতো নারীরাও। মানুষের কত ধরনের শখ থাকে। কেউ গান করেন, কেউ কবিতা আবৃত্তি। তাই বলে পাহাড়ে চড়া কারো শখ হয় নাকি। সাদিয়া উত্তর দিলেন, কেন নয়। যদি কেউ রোমাঞ্চপ্রিয় হয়ে থাকেন, পাহাড়ের উঁচু উঁচু চূড়াগুলো তাকে টানবেই। বাংলাদেশে মাউন্টেইনিয়ার্স অ্যান্ড ট্র্যাকিং ক্লাবের সবার মনের কথাই যেন বললেন ঢাকা ওয়াসায় কর্মরত এই নারী। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এ ধরনের শখের সফল বাস্তবায়ন কি কঠিন নয়? সাদিয়া উত্তর দিলেন, ‘কঠিন, তবে পরিবারের অনুপ্রেরণা সাথে থাকলে অসম্ভব নয়।’ ছোটবেলা থেকেই রোভার স্কাউটের সাথে যুক্ত সাদিয়া জানালেন পরিবারের বিশেষ করে বাবার অনুপ্রেরণা সেই ছোটবেলা থেকেই সঙ্গী তার। জীবনে প্রথম পাহাড়ে চড়ার সাথেও জড়িয়ে আছেন এই বাবাই। তার কাজের সুবাদে বান্দরবান ঘুরতে যাওয়া আর সেখানেই কেওক্রাডাংয়ে চড়া। দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ চূড়ায় আরোহনের পর গত কয়েক বছরে চড়েছেন দেশের প্রায় সবকটি পাহাড়ে। সময় এবং অর্থনৈতিক প্রতিকূলতায় দেশের বাইরে ট্র্যাকিং করার সুযোগ খুব বেশি না হলেও, সেই ইচ্ছাটা যে খুব তীব্রভাবেই আছে সেটা জানাতে ভুল করলেন না সাদিয়া। জানালেন, ‘হিমালয় তো বটেই, ইচ্ছা আছে পৃথিবীর সবগুলো বড় পাহাড়ে একবারের জন্য হলেও নিজের পদচিহ্ন এঁকে দেওয়ার। বাংলাদেশে সুযোগ না থাকায় ভারতের দার্জিলিংয়ে হিমালায়ান মাউটেইনার্স ইনস্টিটিউটের (এইচএমআই) অধীনে ২৮ দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায়ও অংশ নিয়েছেন তিনি। যারা পাহাড়ে আরোহনে আগ্রহী তাদের জানালেন, ‘খুব সহজে, মাত্র ২০০ ডলারে আপনি এই কোর্সটি করতে পারবেন।’ পাহাড়ে ওঠার এই শখ পূরণে পরিবারের উত্সাহের কথা জানালেন ক্লাবের আরেক সদস্য ডায়ানাও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা ডায়ানা বলেন, ‘আমার পরিবার আমাকে বলে, সবার আগে নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করো। তারপর যা করো তাতে আমাদের আপত্তি নেই।’ ডায়ানা জানালেন এজন্য পরিবারের প্রতি তার কৃতজ্ঞতার কথাও। সময়-সুযোগ মিলে গেলে অচিরেই দেশের বাইরে আরেকটি অভিযানে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও জানালেন বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এই নারী। এই দুজনের তুলনায় একটু ভিন্ন তান্নির গল্পটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে স্নাতকোত্তর পড়ুয়া তান্নি পর্বতারোহী হওয়ার শুরুটা হয়েছিল কিছুটা তিক্ততা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই শুনলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ট্যুরিস্ট সোসাইটির উদ্যোগে যাওয়া হচ্ছে কেওক্রাডাং। সাথে সাথেই প্রস্তুতি নিলেন তাদের সঙ্গী হওয়ার। হঠাত্ই ক্লাবের তখনকার সভাপতি আরিফ জানালেন, যাওয়া হচ্ছে না তান্নির! কারণ, এবার দলে তাদের সঙ্গে অন্য কোনো মেয়ে সদস্য যাচ্ছেন না! তবে তান্নির দুঃখ ঘোচে অচিরেই। কেওক্রাডাংয়ের পাশাপাশি এ বছরের শুরুতে ঘুরে এসেছেন সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায়ও। ট্র্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে নিজের আইডল হিসেবে তিনজনই বললেন, দেশের প্রথম নারী হিসেবে হিমালয় জয় করা নিশাত মজুমদারের কথা। তার মতোই এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার স্বপ্ন সাদিয়া-তান্নিদের চোখেও। আর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য পাহাড়ের দুর্গম মৃত্যু উপত্যাকায় হাঁটতেও আপত্তি নেই তাদের।